"উত্তম সফরসঙ্গী সফরের পথকে সহজ ও সুন্দর করে দেয়।"
পুরো পথজুড়ে যার স্নেহপূর্ণ সান্নিধ্য ও অমূল্য দিকনির্দেশনা পেয়েছি—
Homaidi Hasan
আল্লাহ আপনার এই পথচলাকে কবুল করুন এবং দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন, প্রিয় ভাই!
রেলের পথ ধরে সুন্নাহর ঠিকানায়
১. অনুভূতির শুভসূচনা:
৩১ আগস্ট ২০২৬-এর রাত, ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে ১১টার ঘরে। আমি বসে ছিলাম আমাদের ‘বাগান বাড়ি’ ছাত্রমেসে। মেসে তখন মাসশেষের চিরাচরিত হিসাব-নিকাশের মিটিং চলছে। চারপাশের কোলাহল আর হিসাবের নানা গুঞ্জনের মাঝেও আমার মনটা অন্য কোথাও আনমনা হয়ে ছিল।
মাসশেষের এই সময়গুলোতে প্রিয় মানুষেরা কে কী হালে আছে—তা জানার এক অদ্ভুত তাগিদ অনুভব করলাম। আমার পরম প্রিয় এক ভাই, যিনি একই সাথে বন্ধু ও দ্বীনি সুহৃদ—তাঁকে ইনবক্স করলাম।
মেসে তখন মিটিংয়ের খাওয়ার পর্ব শুরু হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে তাঁর বার্তা এলো। তিনি জানালেন, ১ তারিখ দিবাগত রাতে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন। গন্তব্য—‘আস-সুন্নাহ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’। তিনি মূলত Professional Contact Center & Telesales Program কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিলেন। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, আর এখন চূড়ান্ত পর্বের মুখোমুখি হতে সরাসরি উত্তর বাড্ডার সাঁতারকুলের কাজীবাড়িতে ইনস্টিটিউটের মূল কার্যালয়ে উপস্থিত হতে হবে।
২. সিদ্ধান্ত ও মধ্যরাতের ডিজিটাল যুদ্ধ:
ভাই আমাকে হঠাৎই তাঁর সাথে ঢাকা যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। শুনে আমার মনে এক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করতে লাগল—যাব কি যাব না? তবে ভেতরের মন বলছিল, এ এক দুর্দান্ত সুযোগ! প্রথমত, গেলে ট্রেনে করেই যেতে হবে; অথচ জীবনে আমার কখনো ট্রেনে চড়া হয়নি! এটি হতে যাচ্ছে আমার জীবনের প্রথম ট্রেন যাত্রা। দ্বিতীয়ত, সেখানে গেলে শায়খ আহমাদুল্লাহ (হাফিযাহুল্লাহ)-এর সেই বহুল আলোচিত প্রতিষ্ঠানটি স্বচক্ষে দেখার ও জানার সুযোগ মিলবে। আর সবচাইতে বড় কথা—আমার এই প্রিয় ভাইয়ের সফরসঙ্গী হওয়া! তাঁর মতো একজন নেককার মানুষের সান্নিধ্যে পুরো পথটা যে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতায় ভরে উঠবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না।
ভাই তখন গফরগাঁওয়ে তাঁর খালার বাসায় ছিলেন, আর আমি ময়মনসিংহের সানকিপাড়া ‘বাগান বাড়ি’ ছাত্রমেসে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেখা দিল এক নতুন বিপত্তি—টিকিট! ভাই ততক্ষণে গফরগাঁও স্টেশন কাউন্টার থেকে একটি টিকিট কেটে ফেলেছেন। ভাইয়ের খালার বাসা থেকে স্টেশন মাত্র ৫ মিনিটের দূরত্ব হওয়ায় তাঁর জন্য কাজটা সহজ ছিল। কিন্তু আমি যদি যেতে চাই, তবে এত রাতে অনলাইনে টিকিট কাটাই একমাত্র উপায়, না কাটলে আবার টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সমস্যা হলো, রাত তখন ১টা পার হয়ে গেছে। এই মাঝরাতে অনলাইন টিকিট কাটার জন্য ভাইয়ের বিকাশে টাকা নেই, আর আমার তো নিজের কোনো বিকাশ বা ডিজিটাল অ্যাকাউন্টই নেই! কী করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। উপায়ান্তর না দেখে এত রাতে মেসে থাকা আমার স্যারকে ডেকে তুললাম। জানা গেল, স্যারের অ্যাকাউন্টে মাত্র ১০ টাকা আছে, অথচ আমার লাগবে ১৬৫ টাকা! এরপর দৌড়ালাম মেসের সিনিয়র রুমান ভাইয়ের কাছে—তাঁর অ্যাকাউন্টেও টাকা নেই। অন্য এক ভাই, ফাহিম ভাইয়ের অ্যাকাউন্টেও টাকা নেই। অবশেষে তুষার ভাইয়ের কাছে গিয়ে যেন আলোর মুখ দেখলাম; উনার অ্যাকাউন্টে টাকা ছিল এবং তিনি হাসিমুখে সাহায্য করতে সম্মত হলেন।
শুরু হলো অনলাইনের যুদ্ধ! ভাই অফলাইনে ‘ঘ’ বগির ১৫ নম্বর সিট পেয়েছিলেন। আমি অনলাইন সিস্টেমে ঢুকে দেখি ১৮ ও ২২ নম্বর সিট দুটো খালি আছে। আমি ১৮ নম্বর সিটটি নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু হঠাৎ দেখি সেটি ‘সোল্ড’ (বিক্রি) দেখাচ্ছে! কেবল ২২ নম্বর সিটই খালি আছে। ইনবক্সে ভাইয়ের সাথে কথা বলতেই তিনি দেখে বললেন, ১৮ নম্বর সিটটি এখনো খালি আছে। আমি আবার রিচেক করতেই দেখি—হ্যাঁ, আসলেই তো খালি! হয়তো কেউ চেষ্টা করছিল অথবা কারিগরি কোনো ত্রুটির কারণে সাময়িক সোল্ড দেখাচ্ছিল। আমি আর দেরি না করে দ্রুত ১৮ নম্বর সিটটি কনফার্ম করে নিলাম।
৩. সততা, পারিবারিক শিষ্টাচার ও মা-বাবার অনুমতি:
এসব ঝক্কি-ঝামেলা মিটিয়ে যখন টিকিট পেলাম, ঘড়িতে তখন রাত ৩টা! এই সময়ে ঘুমালে নির্ঘাত ফজরের নামাজ কাজা হয়ে যাবে। তাই আর ঘুমানোর ঝুঁকি নিলাম না। ফজর পড়ে সকাল ৬টার দিকে ঘুমাতে গেলাম। সাড়ে সাতটা নাগাদ আব্বু ফোন দিলেন। ছোট ভাইয়ের নটর ডেম কলেজের ভর্তি প্রস্তুতির কিছু বই আব্বু মাসকান্দা সিএনজি স্টেশনে এক সিএনজি ড্রাইভারের মাধ্যমে পাঠাবেন। বইগুলো নিয়ে আসার জন্য ড্রাইভারের নম্বর দিলেন। ড্রাইভারকে তিনি আরও ঘণ্টা দেড়েক পর কল করতে বললেন। আমি আবার একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।
সকাল ৯টার দিকে আব্বু আবার ফোন দিলে ড্রাইভারকে কল করে জানাই যে আমি বই নিতে আসছি। সিএনজি স্টেশনে গিয়ে বই নিয়ে এলাম। এসে ছোট ভাইয়ের বইগুলো দিয়ে দেখি তাকে যে সিটে তুলব, সে সিটে থাকা ছেলেটি তার আসবাবপত্র নিয়ে রুম খালি করে দিচ্ছে। ছোট ভাইয়ের রুম সেটআপ করে দিলাম। এসব ঝামেলা সামলে নিজের রুম আবার মনমতো গোছাতে গোছাতে বেলা গড়িয়ে গেল। ফ্রেশ হয়ে জোহরের নামাজ জামাতে আদায় করে দুপুরের খাবার খেলাম।
যেহেতু মাত্র আড়াই ঘণ্টার মতো ঘুম হয়েছিল, তাই খাবার শেষ করে কিছুক্ষণ পর একটু ঘুমাতে চেষ্টা করলাম।বিকেল ৪টার পর ঘুম থেকে উঠলাম। আসরের নামাজ শেষে বাসায় আব্বুকে ফোন করলাম। আব্বুকে কোনো কিছু না লুকিয়ে কোথায় যাচ্ছি, কার সাথে যাচ্ছি এবং গন্তব্যের উদ্দেশ্য ঠিক কী—সব সত্যি ও পরিষ্কারভাবে খুলে বললাম। আব্বু সব শুনে সানন্দে ও নিশ্চিন্ত মনে অনুমতি দিলেন।মাগরিবের নামাজ পড়ে এবার চূড়ান্তভাবে সফরের জন্য প্রস্তুত হলাম। মেসের এক ছোট ভাই মেহেদীকে সাথে নিয়ে ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সে আমাকে স্টেশনের নিয়মকানুন ও প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা দিল। রাতে মেসে খালা না আসায় আমি আর মিল দিইনি; কারণ ভাইয়েরা রান্নার উদ্যোগই নিয়েছেন আমি বের হওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বে। স্টেশনে গিয়ে নিশ্চিত হলাম আমার ট্রেন আসেনি। পরে আমরা দুজনে বাইরের এক হোটেলে রাতের খাবার সেরে নিলাম। পরে ট্রেন এলে মেহেদী আমাকে তুলে দিয়ে বিদায় নিল। ট্রেন চলতে শুরু করল... আর ওদিকে গফরগাঁও স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠবেন আমার সফরসঙ্গী—আমার প্রিয় ভাই।
৪. ট্রেন: এক চলন্ত পৃথিবী ও গভীর জীবনদর্শন:
ট্রেনটি যখন ধীরগতিতে প্ল্যাটফর্ম ছাড়তে শুরু করল, আমার মনের ভেতর এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ খেলা করে গেল। এতদিন বাহির থেকে ট্রেনকে যেমন দেখে এসেছি, ভেতর থেকে দৃশ্যটা কিন্তু একদমই তেমন মনে হলো না। ট্রেনটির নাম ছিল ‘জামালপুর এক্সপ্রেস’। ভেতরের পরিবেশ ছিল বেশ গোছানো, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর।বগিতে বসে ট্রেনের চারপাশের কারিগরি রূপ দেখে আমি এক গভীর চিন্তায় ডুবে গেলাম—এই প্রকাণ্ড আর সুবিন্যস্ত লোহার বাহনটি তৈরি করতে কত বিপুল মেধা, শ্রম আর প্রকৌশলগত চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হয়েছিল! পরম করুণাময় আল্লাহ মানুষকে যে জ্ঞানের নিয়ামত দিয়েছেন, সেই মেধা ও প্রযুক্তির সুফল এই ট্রেন। নির্মাতারা কত সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করে প্রতিটি কোণ নকশা করেছেন!
বগির কিছু আসন ট্রেনের গতির দিকে আর কিছু আসন উল্টোমুখী দেখে প্রথমে ভাবলাম—সব সিট তো একইমুখী রাখা যেত। কিন্তু পরক্ষণেই গণিত আর যুক্তির মেলবন্ধনটা মাথায় খেলল—সব সিট যদি একদিকে থাকে, তবে গন্তব্যে যাওয়ার সময় সবাই সোজা হয়ে বসলেও ফেরার পথে সবাইকে উল্টোমুখী হয়ে ফিরতে হতো। মানুষ যাতে তার স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী বসতে পারে এবং সুযোগের সমতা বজায় থাকে, হয়তো সেই ভারসাম্য রাখতেই এই চতুর ব্যবস্থা!হুট করে ক্লাসের সেই পদার্থবিজ্ঞানের অংকগুলোর কথা মনে পড়ে গেল! শীত কিংবা গরমে রেললাইন কতটুকু প্রসারিত বা সংকুচিত হবে, পাতের মাঝে কতটুকু ফাঁকা জায়গা না রাখলে লোহা বেঁকে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—যে হিসাবগুলো আমরা খাতায় মেলাতাম। ট্রেনে প্রথম চেপে বাস্তবে সেই রেললাইন দেখতে দেখতে অংকগুলোর কথা বেশ মনে পড়ছিল।
ট্রেন সম্পর্কে এসব ভাবতে ভাবতেই ট্রেনটি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরের বুক চিরে এগিয়ে চলল। রাতের নিস্তব্ধতায় জানালার বাইরে খুব স্পষ্ট কিছু দেখা না গেলেও আবছা অবয়ব আর রাতের আঁধারের মাঝে এক অন্যরকম স্নিগ্ধ অভিজ্ঞতা হচ্ছিল।
ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে ট্রেন অবশেষে গফরগাঁও স্টেশনে এসে থামল। জানালার বাইরে চোখ রাখতেই প্রিয় ভাইটিকে দেখতে পেলাম। হাত নেড়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তিনি হাসিমুখে বগিতে উঠে এলেন। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—আমরা পাশাপাশি সিটে বসার সুযোগ পাই! ফলে পথের দূরত্বের সাথে সাথে আমাদের মধ্যকার ইতস্তত ভাবও ঘুচে গেল।
সিটে বসে ভাই হাসিমুখে আমার প্রথম ট্রেন জার্নির অভিজ্ঞতা জানতে চাইলেন। পাশাপাশি জিজ্ঞেস করলেন—বাসায় জানিয়ে এসেছি কি না এবং তারা সহজে আসতে দিল কি না। আমার মুগ্ধতার কথা জানিয়ে বললাম, প্রথম ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আসলেই অসাধারণ! আর বাসার অনুমতি পাওয়ার বিষয়ে বললাম যে, আব্বুকে কোনো কিছু না লুকিয়ে কোথায় যাচ্ছি, কার সাথে যাচ্ছি এবং গন্তব্যের উদ্দেশ্য ঠিক কী—সব বিস্তারিত খুলে বলার পর তবেই তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে অনুমতি দিয়েছেন।
এরপর যাত্রাপথের পুরোটা সময়জুড়ে ভাই আমাকে জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, দিকনির্দেশনা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে লাগলেন। রাতের ট্রেনের মৃদু দোলানি আর ট্রেনের চাকার একঘেয়ে সুরের মাঝে আমি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তাঁর প্রতিটি কথা শুনছিলাম।
তিনি যেসব কথা বলছিলেন, তা কেবল শিক্ষণীয় ও উপকারীই ছিল না, বরং রাতের ট্রেনের সেই স্নিগ্ধ পরিবেশের সাথে দারুণভাবে মানিয়ে যাচ্ছিল। ভাই আমাদের দুজনের জন্য কফি নিলেন। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আমাদের নানামুখী গল্প জমতে লাগল।
ট্রেনটি একের পর এক প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করার সাথে সাথে তিনি আমাকে স্টেশনগুলোর নাম চেনাচ্ছিলেন।পথের মাঝেই এলো ‘কাওরাইদ’ স্টেশন। স্টেশনের কাছেই একটা মসজিদ দেখিয়ে তিনি বললেন—এই মসজিদ থেকেই তিনি একবার দ্বীনের দাওয়াতে (তাবলিগ) গিয়েছিলেন, যার গল্প তিনি আগে একদিন আমাকে শুনিয়েছিলেন। আজ সেই স্মৃতিঘেরা মসজিদটি স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হলো। এরপর এলো তাঁর নিজ উপজেলা শ্রীপুর। ট্রেন যখন টঙ্গীর কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন চারপাশের লোকজনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো মাইকে। ভাইও আমাকে সাবধান করে বললেন, "টঙ্গী এলাকাটা বেশ বিপজ্জনক! অবশ্য টঙ্গী পেরিয়ে এলে পরিবেশ আবার স্বাভাবিক।"
৫. মধ্যরাতের প্ল্যাটফর্ম ও বাস্তববুদ্ধির পাঠ:
এভাবে ট্রেনের চাকার আওয়াজ আর গল্পের সান্নিধ্যে রাত আনুমানিক ১টার দিকে আমরা ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে এসে পৌঁছালাম। ট্রেন থামতেই আমরা প্ল্যাটফর্মের দিকে গেলাম। তখন মাইকে ঘোষণা করা হলো—এত রাতে প্ল্যাটফর্মে কেউ অবস্থান করতে পারবে না, सबको প্ল্যাটফর্ম ছাড়তে হবে। আমরাও সবার সাথে স্টেশন ভবনের বাইরে বেরিয়ে এলাম। চলার পথে ভাই আমাকে একটা মসজিদ দেখালেন এবং বাসে উঠতে হলে কোন স্থান থেকে ধরতে হয়, তার প্রাথমিক ধারণাও দিলেন।ফুটওভার ব্রিজ পেরিয়ে আমরা অপর পাড়ে গেলাম। সেখান থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দৃশ্যমান হচ্ছিল। ব্রিজের ওপর একটা ছোট ছেলে এসে টাকা চাইছিল, যা আমরা কোনো প্রশ্রয় না দিয়ে এড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। ওপাশ থেকে আবার ফুটওভার ব্রিজ পার হয়ে এসে গভীর রাতেও খোলা জুতার দোকান দেখতে পেলাম। ভাই বললেন, দিনে এখানে অনেক মানুষের ভিড় থাকে।
কিছুক্ষণ ঘুরে স্টেশনের কাছে এসে দাড়ালাম।প্ল্যাটফর্মের সামনে অপেক্ষার ফাঁকে একটি ছোট দোকান থেকে দুটো কলা কিনে দুজনে খেতে খেতে গল্প করছিলাম। এমন সময় অপরিচিত এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল আমাদের কাছে ‘টাইপ-সি’ চার্জার আছে কি না। শহরের বাস্তবতায় সতর্ক ভাই খুব সাবধানে উত্তর দিলেন, “চার্জার তো নেই-ই, আর তার ওপর টাইপ-সি!”সেখানে আমরা অনেকক্ষণ অবস্থান করলাম। এর মধ্যে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম—সুন্নাহ সম্মত বাবরি চুল আর সাধারণ পোশাক পরা এক লোক আমাদের একবার নয়, দু-দুবার এসে সালাম দিয়ে গেল! একটু দূরে গিয়ে দেখলাম সুন্দর পোশাক পরা এক লোক স্টেশনের সাধারণ আশ্রয়হীন মানুষদের সাথেই নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পর আরেক লোক এসে ভাইয়ের কাছে ভৈরবগামী ট্রেনের কথা জানতে চাইলো। ভাই তাকে সংক্ষেপে উত্তর দিলেন। কিছুক্ষণ পর সেই একই লোক আবার ফিরে এসে ভৈরবের বাসের খোঁজ করতে লাগলে ভাই বেশ বুদ্ধিদীপ্ত ও সতর্ক উত্তর দিয়ে তাকে বিদায় করলেন। এরপর আমাকে নিচু স্বরে বললেন, “এদের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হয়। এরা মূলত মানুষের চালচলন আর অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে, সুযোগ বুঝলে পিছু নিয়ে ঝামেলার সৃষ্টি করে।”
অবশেষে প্ল্যাটফর্মের গেট খুললে আমরা ভেতরে ঢুকে রেলওয়ে মসজিদের সামনে গিয়ে বসলাম। মসজিদ তখন তালাবদ্ধ ছিল। এমন সময় এক লোক এগিয়ে এসে ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। ভাই সৌজন্যবশত মুসাফাহা করে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাবেন?” লোকটির উত্তর অস্পষ্ট ঠেকায় ভাই আবার দৃঢ়ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাবেন?” তখন সে ইতস্তত করে বলল, সে নাকি কোথাও যাবে না, এমনিই ঘোরাঘুরি করছে! পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বুঝে ভাই মাত্র এক মিনিটের মাথায় আমাকে নিয়ে সেখান থেকে সরে এলেন এই বলে যে, “এখানে এভাবে বসে থাকাটা ভালো দেখাচ্ছে না, সামনে গিয়ে বসি।”পরে সামনে এসে বসলাম।
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে মাঝেমধ্যে চোখধাঁধানো কয়েকটি চমৎকার এক্সপ্রেস ট্রেন এসে থামছিল, আর আমরা মুগ্ধ হয়ে তা দেখছিলাম।ইতিমধ্যে আব্বু ফোন দিয়ে আমার অবস্থান জানতে চাইলেন। বিমানবন্দর স্টেশনে আছি জেনে তিনি খুব সতর্কতার সাথে চলাফেরা করার তাগিদ দিলেন। আমি আব্বুকে নিশ্চিন্ত করে বললাম, আমরা সাবধানেই আছি।ফজরের সময় হয়ে গেলেও রেল মসজিদ খুলছিল না দেখে আমরা দ্রুত স্টেশনের সামনের একটি মসজিদে গিয়ে জামাতে সালাত আদায় করে নিলাম।
নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে ‘রাইদা’ নামের একটি বাসে উঠে পড়লাম, যা আমাদের উত্তর বাড্ডায় নামিয়ে দেওয়ার কথা। বাসে থাকা অবস্থাতেই আব্বু আবার ফোন দিলে জানাই যে আমরা উত্তর বাড্ডার দিকে যাচ্ছি এবং চিন্তার কোনো কারণ নেই।কিন্তু বাস উত্তর বাড্ডা অতিক্রম করে গেলেও হেলপার আমাদের নামার সংকেত দেয়নি। আমরা ম্যাপ দেখে বুঝলাম নির্ধারিত স্থান ছাড়িয়ে এসেছি! ফলে কালবিলম্ব না করে বাস থেকে নেমে উল্টো পথে হেঁটে কিছুটা পিছিয়ে এলাম। সেখান থেকে একটি অটোতে চড়ে রওনা হলাম সাঁতারকুলের উদ্দেশ্যে।
অটো থেকে নেমে গুগল ম্যাপ দেখে আমরা যখন এগোচ্ছিলাম, তখন একটি মাদ্রাসার ছোট এক ছাত্র আমাদের সঠিক পথ চিনিয়ে আস-সুন্নাহ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটে পৌঁছে দিতে সাহায্য করল। অবশেষে সকালের স্নিগ্ধ আলোয় আমরা এসে দাঁড়ালাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত ঠিকানা—‘আস-সুন্নাহ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’-এর প্রাঙ্গণে!
৬. আস-সুন্নাহ প্রাঙ্গণে: প্রথম মুখোমুখি বাধা ও পর্যবেক্ষণ:
গেটে পৌঁছাতেই একজন গেটম্যান আমাদের মুখোমুখি হলেন। ভাই তাঁর কর্মশালা ও পরীক্ষার কথা জানাতেই গেটম্যান তাঁকে হাজিরা খাতায় সই করতে বললেন। সই শেষ হতেই গেটম্যান আমার দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইলেন আমার পরিচয়। ভাই বললেন, “দূর থেকে এসেছি, তাই ও আমার সহকারী হিসেবে সাথে এসেছে।”শুনেই গেটম্যান বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, পরীক্ষার্থী ছাড়া অতিরিক্ত কোনো সহকারীকে তো ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না! এবার কী করা যায়? তিনি ভেতরের কাউকে ফোন দিয়ে বললেন, “পরীক্ষার্থীর সাথে আরেকজন সহকারী এসেছে, তাঁকে কী করব?” ওপাশ থেকে নাকি নির্দেশ এলো সহকারীকে বাইরে বসিয়ে রাখতে।যাই হোক, গেটম্যান ভাইকে দোতলায় মসজিদে যেতে বললেন আর আমাকে তাঁর পাশের একটি চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতে দিলেন। পাশে থাকা আরেক পরীক্ষার্থী তখন সহকারী যেতে পারে এমন ঘটনা এর কথা বললো।তখন তিনি বললেন, আমি যদি সাথে ওপরে যেতে চাই তবে তাঁকে ওপরে গিয়ে আমাকে দিয়ে আসতে হবে। আর তিনি যে আমাকে সহজে ভেতরে যেতে দেবেন না, তাঁর আচরণে সেটাই প্রকাশ পাচ্ছিল।
এর মাঝে আমি ও ভাই বাইরে গিয়ে রুটি দিয়ে হালকা নাশতা সেরে নিলাম। সেখানে কক্সবাজার থেকে আসা আরেকজন পরীক্ষার্থীর সাথে দেখা হলো। নাশতা শেষে ভেতরে ফিরলে গেটম্যান আবারও আমার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। ভাই বুঝিয়ে বললেন, “সে এখানেই বসবে, মাঝে মাঝে একটু বাইরে ঘুরবে।” ভাই আমাকে রেখে দোতলায় চলে গেলেন।আমি চেয়ারে বসে মোবাইল ফোনে এখানকার উল্লেখযোগ্য স্থান গুলো এখান থেকে কত দূরে তা গুগল ম্যাপ এ দেখছিলাম । একা দীর্ঘ সময় কীভাবে কাটাব তা নিয়ে ভেতরের এক অস্বস্তি থাকলেও বাইরে নিজেকে বেশ শান্ত রেখেছিলাম। একঘেয়েমি কাটাতে সাথে আনা একাডেমিক পড়ালেখার বইটি বের করে পড়তে শুরু করলাম—কারণ সফরের শুরুতেই জানতাম এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অপেক্ষার মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে, তাই পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে বইটি সাথে এনেছিলাম।
বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে গেটম্যানের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছিলাম। একের পর এক নতুন পরীক্ষার্থী ও ট্রেইনাররা আসছিলেন, আর গেটম্যান সবার সাথে বেশ অদ্ভুত আর কঠোর ব্যবহার করছিলেন! ট্রেইনারদের ব্যাগ তল্লাশি করা থেকে শুরু করে আইডি কার্ড দেখানোর নামে অহেতুক সময় নষ্ট করছিলেন। এক জনের ব্যাগ চেক করার সময় বিরক্ত হয়ে সেই লোক বললেন, “আপনি নির্দিষ্ট করে বলে দেন ভেতরে কী কী আনা যাবে না, আমরা তাহলে তা আনব না!” গেটম্যান কোনো স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে দার্শনিক ভঙ্গিতে বললেন, “আধ্যাত্মিক বিষয় বোঝেন না!” আরেকজন ট্রেইনার অবশ্য তর্কে না জড়িয়ে বললেন ছাত্রদের চেক করবেন—এই বলে সোজা হেঁটে চলে গেলেন।
পুরো দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করে বুঝলাম, সিকিউরিটির নিয়মানুবর্তিতা ভালো হলেও সঠিক দিকনির্দেশনা ও কোমল আচরণের মেলবন্ধন থাকলে পরিবেশটি আরও সুন্দর হতে পারত।
এরই মাঝে কিছু পরীক্ষার্থী আমাকে এসে সালাম দিয়ে গেলেন! হয়তো গেটম্যানের পাশে বসে গভীর মনোযোগে বই পড়তে দেখে তারা আমাকে প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্বশীল বা সিনিয়র ভেবেছিলেন।
৭. অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও আত্মোপলব্ধি:
কিছুক্ষণ পর আমার মতো আরেকজন সহকারীকে এসে গেটম্যান আটকে দিলেন। বেচারা দাঁড়িয়ে রইল। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলা হচ্ছে, ভেতরে তাদের অন্য কোনো পরিচিত লোক থাকলে তবেই তাদের দুজনকেই যেতে দেবে, নতুবা কোনো একজন লোক এর কথা বললো যার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ওই সহকারী ছেলেটি আমার পাশে বসল। সে শায়খ আহমাদুল্লাহর একটা বই সামনের রুম থেকে চেয়ে এনে পড়তে শুরু করল। যাই হোক, আমি ভাবলাম গেটম্যানকে ওয়াশরুমের কথা জিজ্ঞেস করি, কিন্তু দেখি তিনি হঠাৎ কোথায় যেন চলে যাচ্ছেন। অন্য একজনকে জিজ্ঞেস করলে তিনি খুব সুন্দর ও অমায়িক ব্যবহারে আমাকে পথ দেখিয়ে দিলেন।
ওয়াশরুম যাওয়ার পথে করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় বিভিন্ন ক্লাসরুমের দিকে চোখ গেল। ভেতরে সুন্দর পরিবেশে ক্লাস চলছে দেখে আমি অবাক ও মুগ্ধ হলাম! মনে মনে ভাবলাম—বাইরে বসে থেকে ভেতরের এই দৃশ্যগুলো দেখতে না আসলে অনেক বড় কিছু মিস হয়ে যেত!
প্রয়োজন সেরে ফিরে আটকে থাকা সেই অন্য সহকারী ছেলেটিকে দেখতে পেলাম। তাকে বললাম, “এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে একটু ঘুরে দেখুন।” সে বোধহয় আমার কথা বুঝতে পারেনি; ভেবেছিল আমি হয়তো শহরের বাইরে গিয়ে ঘোরার কথা বলছি!আমি আর কথা না বাড়িয়ে আবারও ভেতরের ক্লাসরুমগুলোর দিকে এগিয়ে গেলাম। ওয়াশরুমের পাশ দিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় পৌঁছে গেলাম।
দোতলায় অনেক মানুষের সমাগম। আমি রুমে না ঢুকে বারান্দা দিয়ে আনমনে হাঁটতে লাগলাম। এমন সময় আমার সেই প্রিয় ভাইটির সাথে দেখা হলো; তিনি এসে তাঁর উপস্থিতি জানান দিলেন। ভাই আমাকে পুরো দোতলা ঘুরে দেখাচ্ছিলেন, বিভিন্ন ইসলামিক বই দেখাচ্ছিলেন। সেখান থেকে আমরা দুজন একসাথে একটি ছবিও তুললাম।কিছুক্ষণ পর বার্তা এলো—পরীক্ষার্থীদের এখন একটি বিশেষ ক্লাসে অংশ নিতে হবে। ভাই ক্লাসে চলে গেলে আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম সেই দাঁড়িয়ে থাকা অন্য সহকারী ছেলেটিকে নিয়ে আসার জন্য। তাকে সোজা বাংলায় বললাম, “আসুন, আমি ভেতরে সব চমৎকার ব্যবস্থা দেখে এসেছি। আপনিও আসুন, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সুন্দর ধারণা পাবেন।” কিন্তু সে কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে রাজি হলো না।
তাকে ছাড়াই আমি আবার ভেতরে চলে গেলাম। গেইডম্যান তখন সেখানেই ছিল তবে কিছু বলেনি। এবার করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় অধিকাংশ মানুষ আমাকে শ্রদ্ধার সাথে সালাম দিচ্ছিলেন। চলার পথে দেয়ালজুড়ে টাঙানো সুন্দর সুন্দর দিকনির্দেশনামূলক পোস্টারগুলোর ছবি তুলছিলাম। ক্লাসরুমগুলোরও কিছু ছবি নিলাম।আবার দোতলায় উঠে ছবি তোলার সময় এক ট্রেইনারের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে গেলে দরজার ওপাশ থেকে একজন স্যার আমাকে ডাক দিলেন। আমি শালীনতা বজায় রেখে ভেতরে ঢুকে সালাম দিলাম। স্যার সালামের উত্তর দিয়ে জানতে চাইলেন, “আপনার নাম কী?”
আমি বললাম, “শিহাব।”
“কিসে পড়ালেখা করছেন?”
আমি উত্তর দিলাম, “আমি এইচএসসি শেষ করে এডমিশন প্রস্তুতি নিচ্ছি, এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেব ইনশাআল্লাহ।”
এরপর তিনি ছবি তোলার কারণ জানতে চাইলে আমি বিনীতভাবে বললাম, “আমি মূলত শায়খ আহমাদুল্লাহ স্যারের আস-সুন্নাহর এই সুন্দর কার্যক্রমগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলাম। পরিবেশটা এত চমৎকার যে মনে হলো একটা ছবি তুলে রাখি, তাই তুলেছিলাম।”
তিনি অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করলে আমি তৎক্ষণাৎ বিনীতভাবে ‘সরি’ (দুঃখ প্রকাশ) বললাম। তিনি চলে যাওয়ার ইশারা করতেই আমি বিনম্রভাবে রুম থেকে বের হয়ে এলাম।
আস-সুন্নাহ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট মূলত কেবল একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়; এটি দক্ষ ও নীতিবান জনশক্তি গড়ার এক নিরলস প্রচেষ্টা। শায়খ আহমাদুল্লাহ (হাফিযাহুল্লাহ)-এর সুদূরপ্রসারী ভাবনায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানে তরুণদের কারিগরি ও আইটি দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক ও দ্বীনি দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়, যেন তারা অর্জিত দক্ষতাকে হালাল উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগাতে পারে।
আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের এসব বাস্তবমুখী ও সুন্দর কল্যাণকর কার্যক্রম যেকোনো সত্যপ্রত্যাশী ও গঠনমূলক চিন্তার মানুষ যদি স্বচক্ষে দেখেন, তবে তাঁর অন্তর থেকে শায়খ আহমাদুল্লাহ (হাফিযাহুল্লাহ) সহ এর পেছনে নিরলস পরিশ্রম করে যাওয়া প্রতিটি মানুষের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবেই গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক দুআ চলে আসবে।
৮. দুপুরের সালাত, অপেক্ষা ও আস-সুন্নাহকে বিদায়:
দুপুরের জোহরের নামাজের সময় হলে আমরা সবাই একসাথে জামাতে সালাত আদায় করে নিলাম। নামাজ শেষের পরও অপেক্ষার পালা চলতে লাগল। অবশেষে বিকেল ৩ টা এর আরো পর আমাদের দুপুরের খাবার দেওয়া হলো।
খাবার শেষ করার কিছুক্ষণ পরই চূড়ান্ত বাছাইয়ের ফলাফল ঘোষণা করা হলো। ফলাফল ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষে আমরা আস-সুন্নাহ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণকে বিদায় জানিয়ে উত্তর বাড্ডার উদ্দেশ্যে অটোতে চড়ে বসলাম।
রাস্তায় তখন থমকে থাকা তীব্র যানজট! বাসের অপেক্ষায় না থেকে আমরা দুজনে হাঁটা শুরু করলাম। অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করার পর অবশেষে একটি বাসে উঠতে পারলাম।
৯. যমুনা এক্সপ্রেস ও এক রোমাঞ্চকর ফিরতি যাত্রা:
বাস যখন আমাদের বিমানবন্দর স্টেশনে নিয়ে নামিয়ে দিল, ঠিক তখনই স্টেশনে এসে পৌঁছাল ‘যমুনা এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে এত মানুষের ভিড় যে আমরা কোনো সিট পেলাম না। যদি এই ট্রেনে না উঠি, তবে পরবর্তী ট্রেনের জন্য রাত পর্যন্ত স্টেশনে অপেক্ষা করতে হবে!
নানা দিক বিবেচনা করে লোকোমোটিভ মাস্টারের সাথে কথা বলে ২০০ টাকার বিনিময়ে আমরা সেই ট্রেনেই দাঁড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
তখন আমার যে শারীরিক অবস্থা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আগের দিন দুই দফায় মিলিয়ে বড়জোর চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টার মতো ঘুম হয়েছিল, আর গত পুরো রাত তো একদমই ঘুমানো হয়নি! কিন্তু পাশে আমার সেই প্রিয় ভাইটি থাকায় অদ্ভুতভাবে শরীরের সমস্ত ক্লান্তি আর অবসাদ যেন নিমেষেই উবে গিয়েছিল।
ট্রেনের ভেতরে যাত্রার ফাঁকে ফাঁকে আমরা ট্রেনের চালক ও দায়িত্বশীলদের কাছে ট্রেন চলাচলের নানা খুঁটিনাটি ও কারিগরি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছিলাম। তাঁরাও খুব আন্তরিকভাবে উত্তর দিচ্ছিলেন।ভাই লোকোমোটিভ মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা ট্রেন থামাতে হবে না চলবে, তা বোঝেন কীভাবে?”লোকোমোটিভ মাস্টার বেশ রসিক মানুষ। তিনি হেসে উত্তর দিলেন, “এই তো, সামনে দেখে দেখেই বুঝি!”ভাই তখন বললেন, “এখানে তো কম্পিউটারের মতো থাকার কথা, যা দেখে বোঝা যায়। আপনাদের নেই?”
তিনি বললেন, “আমাদের এসব লাগে না, এসব হলো ফ্যাশন!”
এরপর ভাই আবার জিজ্ঞেস করলেন, “ট্রেন এত নড়াচড়া করে কেন?”
তিনি জবাবে বললেন, “রেললাইনের সমস্যা, আর কিছু না!”
ভাই তাঁদের কাছে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “যমুনা এক্সপ্রেসের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এত অভিযোগ কেন? এই ট্রেন এত দেরি করে কেন চলে?”
দায়িত্বশীলরা নিঃসংকোচে বললেন, “এসব তো উপর মহল থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ট্রেন কখন ছাড়বে বা কোথায় থামবে—তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। ভালো সেবা পেতে হলে যাত্রীদের উচিত এই অভিযোগগুলো ওপরের কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো।”
এরপর যখন রিংয়ের মতো কিছু দিয়ে টোকেন এক্সচেঞ্জ করা হচ্ছিল, ভাই জিজ্ঞেস করলেন ওটা কী। আমি আস্তে করে ভাইকে বুঝিয়ে বললাম যে এটা টোকেন এক্সচেঞ্জ হচ্ছে। লক্ষ্য করলাম, কিছু স্টেশনে রিং ছাড়া সরাসরি হাতে হাতেই এক্সচেঞ্জ করে নিল।
পরে রাতে যখন লাল, হলুদ ও সবুজ বাতিগুলো দেখতে পেলাম, তখন পুরো বিষয়টা বুঝতে পারলাম— লাল বাতি মানে থামার সংকেত, হলুদ মানে গতি কমাতে হবে, আর সবুজ মানে লাইন নিরাপদ, চলা যাবে।
১০. নীড়ে ফেরা ও ভ্রমণের সফল সমাপ্তি:
যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেনটি যাত্রাপথের প্রায় প্রতিটি ছোট-বড় স্টেশনেই থামছিল। ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে ধীরগতিতে এগোতে এগোতে একসময় গফরগাঁও স্টেশন চলে এলো। আমার পরম প্রিয় ভাইটি গফরগাঁওয়ে নেমে গেলেন। তাঁর বিদায়ের পর ট্রেনের জানালার বাইরে তাকিয়ে আমি একাকী আমার গন্তব্যের দিকে এগোতে লাগলাম।অবশেষে রাত ১০টার পর ট্রেন এসে পৌঁছাল আমার চেনা শহর—ময়মনসিংহ স্টেশনে।
সারাদিন ঘুম আর বিশ্রামের অভাব থাকায় বাসার সবাই বেশ চিন্তিত ছিলেন। স্টেশনে পৌঁছানো পর্যন্ত আব্বু এবং ভাই চার-পাঁচবার করে ফোন দিয়েছিলেন। ভাইকে ইনবক্সে খোঁজখবর প্রদান করি, আর আব্বুকে ট্রেন থেকে নামার পর কল দিয়ে জানাই।স্টেশন থেকে সানকিপাড়ার ‘বাগান বাড়ি’ ছাত্রমেসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত সাড়ে ১০টা বেজে যায়। রুমে গিয়ে প্রিয় ভাইটিকে ইনবক্সে বার্তা পাঠালাম, “ভাই, আমি মেসের রুমে পৌঁছে গেছি।” এতে ভাই নিশ্চিন্ত হলেন।
১১. উপসংহার:
জীবনে প্রথমবারের মতো ট্রেনে চড়ার রোমাঞ্চ, মধ্যরাতের স্টেশনের অভিজ্ঞতা, আর আস-সুন্নাহ প্রাঙ্গণের স্নিগ্ধ পরিবেশ—সব মিলিয়ে এই সফরটি আমার জীবনে কেবল একটি সাধারণ যাত্রা হয়ে থাকেনি, বরং এটি হয়ে রইল অভিজ্ঞতা, অনুভূতির গভীরতা এবং আত্মোপলব্ধির এক চমৎকার অধ্যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।