অনেক ভেবেছি, শেষ অবধি আমি কবি
অনেক ভেবেছি—
আমি কি সত্যিই কোনো পথের মানুষ,
নাকি পথ হারিয়ে ফেলা
একটা নীরব সন্ধ্যার ছায়া?
অনেক ভেবেছি—
আমার কি কোনো পরিচয় আছে,
নাকি ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়া
একটি অচেনা মুখ মাত্র?
শেষ অবধি বুঝলাম,
আমারও একটি ঠিকানা আছে—
কাগজের সাদা পাতায়,
কালির কালো অক্ষরে,
নিঃশব্দ রাতের বুকের ভেতর
যেখানে শব্দেরা এসে
আমার সঙ্গে কথা বলে।
আমি রাজা নই,
আমার কোনো সিংহাসন নেই,
আমি যোদ্ধা নই,
হাতে নেই কোনো তলোয়ার;
তবু বুকের ভেতর
একটি অদৃশ্য যুদ্ধ চলে প্রতিদিন—
সেই যুদ্ধের রক্তক্ষরণ
আমি শব্দ দিয়ে লিখে রাখি।
আমি হাসি,
কিন্তু সেই হাসির নিচেও
কিছু না-বলা গল্প থাকে;
আমি কাঁদি,
কিন্তু চোখের জলের আগেই
কাগজ ভিজে যায়।
মানুষ ভাবে—
কবি বুঝি শুধু ফুল দেখে,
চাঁদ দেখে, নদী দেখে,
বসন্তের রঙে হারিয়ে যায়।
কেউ জানে না,
কবি কখনো কখনো
একটি শুকনো পাতার মধ্যেও
একটি মানুষের জীবন দেখতে পায়।
ঝরে পড়া পাতার মতো
কত মানুষকে দেখেছি—
একদিন ছিল সবুজ,
একদিন ছিল প্রাণে ভরা,
তারপর সময়ের বাতাস এসে
তাদেরও মাটির কাছে নামিয়ে দিয়েছে।
তাই মৃত্যু আমাকে ভয় দেখায় না,
বরং মনে করিয়ে দেয়—
যে দেহ নিয়ে এত অহংকার,
একদিন সে মাটির ঘ্রাণ হবে;
যে নাম নিয়ে এত গর্ব,
একদিন সে হয়তো
কারও স্মৃতির শেষ প্রান্তে
একটি ক্ষীণ শব্দ হয়ে থাকবে।
তবু আমি লিখি।
কারণ আমি জানি,
জীবন ক্ষণিকের—
কিন্তু একটি সত্যিকারের শব্দ
কখনো কখনো
মানুষের চলে যাওয়ার পরও
বেঁচে থাকে।
আমি ভালোবাসা পেয়েছি,
আবার হারানোর স্বাদও পেয়েছি;
আপন ভেবেছি কাউকে,
আবার দেখেছি—
সব আপন মানুষ
চিরকাল আপন থাকে না।
কেউ এসেছে বসন্ত হয়ে,
কেউ চলে গেছে শরতের মতো;
কেউ রেখে গেছে হাসি,
কেউ রেখে গেছে
নীরবতার দীর্ঘ ছায়া।
আমি কাউকে দোষ দিই না।
কারণ মানুষ তো নদীর মতো—
সবাই নিজের স্রোতে চলে,
কেউ তীরে থাকে,
কেউ মাঝপথে ডুবে যায়,
কেউ আবার
অন্য কোনো সমুদ্রের দিকে
চলে যায় নিঃশব্দে।
আমিও চলেছি।
কখনো আলোয়,
কখনো অন্ধকারে,
কখনো নিজের কাছেই
নিজেকে অচেনা লেগেছে।
কখনো মনে হয়েছে—
সবকিছু ছেড়ে দিই,
কিছুই আর লিখব না।
তারপর কোনো এক গভীর রাতে
একটি শব্দ এসে কানে বলেছে—
“তুমি তো এখনও বেঁচে আছো,
তাহলে গল্প শেষ হলো কোথায়?”
আমি আবার কলম ধরেছি।
কারণ আমার কাছে কলম
শুধু একটি কলম নয়—
এ আমার নীরব চিৎকার,
এ আমার না-পারা কথার ভাষা,
এ আমার হারিয়ে যাওয়া দিনের
একটি ছোট্ট স্মৃতিফলক।
যা মুখে বলতে পারিনি,
তা লিখেছি।
যাকে কাছে পাইনি,
তাকে কবিতায় কাছে বসিয়েছি।
যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি,
তার জন্য শব্দের ভেতর
একটি পৃথিবী বানিয়েছি।
যে কান্না কাউকে দেখাইনি,
তা কাগজের কাছে রেখে দিয়েছি।
অনেক ভেবেছি—
আমি আসলে কে?
শেষ অবধি উত্তর পেলাম—
আমি কোনো অসাধারণ মানুষ নই,
আমি শুধু অনুভব করতে জানি।
আমি ভাঙা জিনিসের শব্দ শুনি,
নিঃশব্দ মানুষের চোখ পড়ি,
বিদায়ের ভেতরও
একটু ভালোবাসা খুঁজি।
আমি রাতের আকাশে
শুধু তারা দেখি না,
দেখি—
কত অন্ধকার পেরিয়েও
একটি ছোট আলো
নিজেকে জ্বালিয়ে রাখে।
আমি বৃষ্টিতে
শুধু ভেজা রাস্তা দেখি না,
দেখি—
আকাশও কখনো কখনো
নিজের ভার নামিয়ে রাখে।
আমি শূন্যতায়
শুধু কিছু না-থাকা দেখি না,
দেখি—
সেখান থেকেই তো
নতুন কিছুর জন্ম হয়।
তাই আজ আর পরিচয় খুঁজি না।
কেউ যদি জিজ্ঞেস করে—
“তুমি কে?”
আমি বলব না
আমি বড় কেউ,
আমি বিখ্যাত কেউ,
আমি পৃথিবী জয় করা কেউ।
আমি শুধু বলব—
আমি সেই মানুষ,
যে নিজের ভাঙা হৃদয় দিয়ে
অন্যের জন্য ফুল আঁকে।
আমি সেই মানুষ,
যে নিজের অন্ধকারের মধ্যেও
অন্যের জানালায় আলো খোঁজে।
আমি সেই মানুষ,
যে হারিয়ে গিয়েও
শব্দের হাত ধরে
নিজের কাছে ফিরে আসে।
অনেক ভেবেছি,
অনেক পথ হেঁটেছি,
অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি।
শেষ অবধি
জীবন আমাকে খুব সহজ একটি উত্তর দিয়েছে—
আমি হয়তো সবকিছু হতে পারিনি,
হয়তো পৃথিবীর সব স্বপ্ন
আমার জন্য লেখা ছিল না,
হয়তো আমার গল্পেও
অনেক অসমাপ্ত অধ্যায় আছে—
তবু আমার একটি পরিচয় আছে।
আমি অনুভবের সন্তান,
নিঃশব্দতার ভাষা,
অপ্রকাশিত কথার আশ্রয়।
আমি—
শেষ অবধি একজন কবি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।