*দায়িত্বের ভার*
পর্ব ১: 16 বছরের কাঁধ
সুমনের বয়স 16। ক্লাস টেনে পড়ে। বন্ধুরা সকালে ক্রিকেট খেলে, ও সকাল 6টায় বাজারে যায়।
আব্বা রিকশা চালাতো। গত বছর অ্যাক্সিডেন্ট। একটা পা নাই এখন। আম্মা মানুষের বাড়ি কাজ করে। মাসে 5000 টাকা।
সংসারে 5 জন মানুষ। ছোট বোন 2টা, দাদী। মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা শেষ।
সেদিন সুমনের SSC রেজিস্ট্রেশন ফি 2000 টাকা লাগবে। আম্মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললো, "বাবা, এবার দিতে পারবো না রে। দাদীর ওষুধ কিনতে হবে।"
সুমন কিছু বললো না। শুধু স্কুলের খাতাটা বুকের ভিতর চেপে ধরলো। ওই খাতার প্রতি পাতায় ওর স্বপ্ন লেখা - "ডাক্তার হবো"।
রাতে ছাদে বসে আকাশ দেখে। মনে বলে, "আল্লাহ, দায়িত্বটা কি আমার কাঁধেই দিতে হইলো? আমি তো এখনো বাচ্চা।"
---
পর্ব ২: ভারী কাঁধ, হালকা হাসি
সুমন স্কুল ছেড়ে দিলো। সকালে বাজারে চায়ের দোকানে কাজ নিলো। 12 ঘণ্টা ডিউটি। মাসে 7000 টাকা।
স্যার রাস্তায় দেখা হলে ডাকে, "সুমন, পড়া ছাড়লি কেন?"
সুমন হাসে। বলে, "স্যার, পড়া ছাড়ি নাই। পড়াটারে একটু ছুটি দিছি। সংসারটা আগে বাঁচাই।"
বন্ধুরা ফুটবল খেলতে ডাকে। সুমন যায় না। বলে, "সময় নাই রে।" আসলে সময় আছে। সাহস নাই। পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল, গায়ে চায়ের দাগ - বন্ধুদের সামনে লজ্জা লাগে।
রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে। আব্বা বসে থাকে দরজায়। একটা পা নাই, তবুও ছেলের জন্য জেগে থাকে। বলে, "খাইছিস বাবা?"
সুমন মিথ্যা বলে, "হ্যাঁ আব্বা। পেট ভরে খাইছি।" পেটের মধ্যে ক্ষুধা, মুখে হাসি।
দাদী বলে, "নাতি, তুই বিয়া কবে করবি?"
সুমন বলে, "দাদী, আমার বিয়া হইছে। আমার বিয়া হইছে দায়িত্বের সাথে।"
---
পর্ব ৩: ভার কমে না, কাঁধ শক্ত হয়
5 বছর কাটলো। সুমনের বয়স 21। চায়ের দোকানের মালিক এখন ও নিজে। 3 জন কর্মচারী।
ছোট বোন 2টা এখন স্কুলে যায়। দাদীর ওষুধ ঠিকমতো আসে। আব্বা এখন আর রিকশা চালায় না। চায়ের দোকানে বসে থাকে। কাস্টমার আসলে বলে, "আমার ছেলে... ওই যে, চা বানায়।"
সুমনের বিয়ের কথা আসে। মেয়ের বাপ বলে, "ছেলে কী করে?"
সুমন বলে, "চা বেচি চাচা।"
মেয়ের বাপ মুখ ঘুরায়। "চা বেচা ছেলের কাছে মেয়ে দিবো না।"
সুমন কষ্ট পায় না। ও জানে - যে দায়িত্বের ভার বইতে পারে, সে ভালোবাসার ভারও বইতে পারবে।
একদিন পুরান স্যার দোকানে আসলো। চা খেয়ে বললো, "সুমন, তুই ডাক্তার হস নাই। কিন্তু তুই ডাক্তারের চেয়ে বড় হইছিস। ডাক্তার 1টা জীবন বাঁচায়। তুই 5টা জীবন বাঁচাইছিস।"
সুমনের চোখে পানি। 5 বছর পর প্রথমবার কাঁদলো। স্যারের সামনে না। রাতে ছাদে গিয়ে। আকাশের দিকে তাকায় বললো, "আল্লাহ, দায়িত্বের ভারটা ভারী। কিন্তু এই ভার বইতে পেরে আমি মানুষ হইছি।"
---
শেষ পর্ব: ভার কারে বলে?
আজ সুমনের বয়স 30। ওর চায়ের দোকান এখন 3টা। ছোট বোন 2টা ভার্সিটিতে পড়ে। একজন ডাক্তার, একজন টিচার।
আব্বা মারা গেছে 2 বছর। মরার আগে সুমনের হাত ধরে বলছিলো, "বাবা, তুই আমার পা। তুই না থাকলে আমি 10 বছর আগেই মরে যেতাম।"
সুমন এখনো রোজ ভোর 5টায় উঠে। দোকান খুলে। কাস্টমার আসলে চা দেয় আর হাসে।
একদিন একটা 16 বছরের ছেলে আসলো। চোখে পানি। বললো, "চাচা, চাকরি দিবেন? আব্বা নাই। সংসার চালাইতে হবে।"
সুমন ছেলেটার দিকে তাকালো। নিজের 16 বছরের চেহারাটা দেখতে পেলো।
চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, "বাবা, দায়িত্বের ভারটা কাঁধে নিস না। বুকে নিস। কাঁধে নিলে কাঁধ ভেঙে যায়। বুকে নিলে বুকটা বড় হয়। আর বুক বড় হইলে মানুষ বড় হয়।"
ছেলেটারে কাজ দিলো। সাথে রাতে পড়ার ব্যবস্থা। বললো, "কাজ করবি, পড়বিও। আমার মতো ভুল করিস না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।