মহাবিশ্বের ভাষা ও এক-এর দর্শন: গণিত যেভাবে পরম অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয় -
© প্রিন্স ফ্রেরাসে
মহাবিশ্বকে বুঝতে হলে কোন ভাষা সবচেয়ে বেশি কার্যকরী? এই প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি বলেছিলেন, "মহাবিশ্ব নামক এই বিশাল গ্রন্থটি যদি আমরা পড়তে চাই, তবে তার ভাষা আমাদের জানতে হবে। আর এই ভাষাটি অন্য কিছু
নয়, তা হলো গণিত"। গণিত কেবল মানুষের আবিষ্কৃত কোনো বিমূর্ত হিসাবের খাতা নয়, বরং এটি হলো এই প্রকৃতির নিজস্ব লিপি। গণিতে যা পরম সত্য, স্থান ও কালের সীমানা পেরিয়ে এই অবিনশ্বর বাস্তবেও তা ধ্রুব।
আমরা যখন কাগজের পাতায় একটি সাধারণ সমীকরণ দেখি: ২ + ২ = ৪, তখন তা কেবল কিছু সংখ্যার অবান্তর খেলা মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবেও যখন দুটি জড় বস্তুর সাথে আরও দুটি বস্তু যোগ করা হয়, প্রকৃতি ঠিক চারটি বস্তুরই জোগান দেয়। এই মহাজাগতিক শৃঙ্খলা প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্ব কোনো বিশৃঙ্খল আকস্মিকতা নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ও অমোঘ গাণিতিক নিয়মের সুতোয় বাঁধা। আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে এক গভীর অস্তিত্ববাদী সত্য।
গণিতের গভীরে প্রবেশ করলে আমরা এক বিস্ময়কর সত্য দেখতে পাই। সমগ্র সংখ্যাতত্ত্বের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র সংখ্যার ওপর তা হলো "১"। প্রতিটি সংখ্যার অস্তিত্ব মূলত এই "১"-এরই পৌনঃপুনিক বা বারবার ঘটে চলা প্রকাশ। ২ মানে হলো ১ + ১; ৩ মানে হলো ১ + ১ + ১; ৪ মানে হলো ১ + ১ + ১ + ১। এভাবে অনন্তকাল ধরে আপনি যত সংখ্যাই তৈরি করুন না কেন, প্রতিটি সংখ্যার অন্তরে "এক" বিদ্যমান। প্রতিটি সংখ্যা তার নিজের প্রকাশের জন্য এই "এক"-এর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। কিন্তু "১" সংখ্যাটি নিজে অস্তিত্বশীল হওয়ার জন্য অন্য কোনো সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। সে আদি, অনন্য এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। এক-এর এই পরম নির্ভরশীলতাহীনতাই অনন্ত সংখ্যার মহাযাত্রাকে সম্ভব করেছে।
এবার এই গাণিতিক সত্যকে আমাদের দৃশ্যমান বাস্তব মহাবিশ্বের ওপর প্রয়োগ করা যাক। এই মহাবিশ্ব কোটি কোটি কণা, শক্তি, গ্যালাক্সি আর প্রাকৃতিক নিয়মের এক সুবিশাল মহাসমাবেশ। এটি যেন অসংখ্য "সংখ্যা"র একটি জটিল ক্যানভাস। আধুনিক বিজ্ঞান ও মহাবিশ্বতত্ত্ব আমাদের নিশ্চিতভাবে বলে, এই মহাবিশ্বের একটি সুনির্দিষ্ট সূচনা বা আদি বিন্দু ছিল, যাকে আমরা বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ বলি। যার উপাদানগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এবং যা একসময় তাপীয় মৃত্যুর মতো কোনো প্রক্রিয়ায় ধ্বংসের মুখোমুখি হবে।
দর্শনের ভাষায়, যার শুরু ও শেষ আছে এবং যা পরিবর্তনশীল, তা কখনো "স্বয়ংসম্পূর্ণ" বা চূড়ান্ত বাস্তবতা হতে পারে না। একে বলা হয় নির্ভরশীল বা আপেক্ষিক সত্তা (Contingent Being)। যা নিজে একসময় ছিল না, তা কখনো স্বতস্ফূর্তভাবে নিজের অস্তিত্বের কারণ হতে পারে না। কারণ কোনো কিছু নিজে অস্তিত্বহীন থাকা অবস্থায় নিজেকে সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে না। অতএব, এই খণ্ড ও নির্ভরশীল মহাবিশ্বের অস্তিত্ব বজায় থাকার জন্য এমন এক "পরম অপরিহার্য সত্তা" (Necessary Being) থাকা যুক্তিগতভাবেই অনিবার্য, যিনি নিজে অনাদি, অবিনশ্বর, অकारण (Uncaused) এবং সমস্ত সৃষ্টির পরম উৎস। গণিতে যেমন সমস্ত সংখ্যার উৎস ও ভিত্তি "১", অস্তিত্বের সমীকরণে তেমনি সবকিছুর মূল ভিত্তি সেই একক স্রষ্টা।
এই পর্যায়ে এসে একটি বহুল প্রচলিত প্রশ্ন সামনে আসে: "স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল?" কিন্তু যুক্তির কষ্টিপাথরে এই প্রশ্নটি নিজেই একটি বড় ধরনের যৌক্তিক ভ্রান্তি (Logical Fallacy)। একে দর্শনের পরিভাষায় "অনবস্থা দোষ" বা 'Infinite Regress' বলা হয়। স্রষ্টাকে যদি অন্য কেউ সৃষ্টি করে থাকে, তবে তিনি আর "চূড়ান্ত কারণ" থাকেন না; তিনিও একটি নির্ভরশীল সংখ্যা বা সৃষ্টিতে পরিণত হন। তখন প্রশ্ন আসবে তার সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করল? এভাবে কারণের খোঁজে পেছনে যেতে থাকলে কোনোদিন কোনো আদি কারণে পৌঁছানো সম্ভব হবে না, ফলে বর্তমানের এই মহাবিশ্বও কখনো অস্তিত্ব লাভ করতে পারত না। যেহেতু মহাবিশ্ব বাস্তবে বিদ্যমান, তাই এই কার্যকারণের শৃঙ্খলকে কোথাও না কোথাও থামতে হবে এমন এক সত্তায়, যিনি নিজে সৃষ্টি নন বরং সমস্ত সৃষ্টির আদি কারণ।
গণিতের অমোঘ নিয়ম পরম শূন্যতার এই অসারতা খুব সুন্দরভাবে প্রমাণ করে। শূন্য থেকে কখনো কোনো অস্তিত্বশীল সংখ্যার জন্ম হতে পারে না। ০ + ০ + ০ = সর্বদা ০। শূন্যকে আপনি যতই যোগ, বিয়োগ বা গুণ করুন না কেন, ফলাফল সর্বদা শূন্যই থাকবে। পরম শূন্যতা বা প্রকৃত অস্তিত্বহীনতা কখনো স্বতস্ফূর্তভাবে মহাবিশ্বের মতো এক অনন্ত বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে না। যুক্তির অকাট্য নিয়ম বলে, যদি সৃষ্টির শুরুতে কেবল "পরম শূন্যতা" থাকত, তবে আজকেও কেবল শূন্যতাই বিরাজ করত। যেহেতু আজ আমরা আছি, মহাবিশ্ব আছে তার মানে এমন এক পরম সত্তা সবসময় ছিলেন, যাঁর কোনো শুরু নেই।
তাই, কার্যকারণের এই অনন্ত শৃঙ্খলকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমস্ত খণ্ড কারণের পেছনে একজন "আদি কারণ" (First Cause) থাকা গাণিতিক ও যৌক্তিকভাবে আবশ্যক। সমস্ত নশ্বর অস্তিত্বের পেছনে একজন অবিনশ্বর, অনন্য এবং একক সত্তা থাকা অনিবার্য। আর তিনিই হলেন সেই পরম "এক", মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা।
লেখক: মোঃ মেহেদী হাসান ওরফে Prince Frerase -
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।