জুলাইয়ে'র সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এখনো মনে পড়ে, কীভাবে এ দেশের জেন-জি প্রজন্ম চূড়ান্ত মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় শত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। ইতিহাসের সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়—২০২৪ সালের "জুলাই গণঅভ্যুত্থান" —শুধু একটি আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির জন্য এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম।
একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে সেই আন্দোলনের অংশ হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। খুব কাছ থেকে দেখেছি এবং অনুভব করেছি সেই দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত। কতটা বেদনাময়, কতটা অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল সেই সময়! না খেয়ে, অর্ধাহারে থেকেও হাজারো শিক্ষার্থী রাজপথে নেমেছিল। পরিবারের অসংখ্য নিষেধাজ্ঞা, ভয়ভীতি ও উদ্বেগ উপেক্ষা করে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছিল।
আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে অনেককে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হুমকি, মামলা ও নির্যাতনের আশঙ্কায় দিন কাটাতে হয়েছে। অনেক পরিবার সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে চেয়েছে। আমার নিজের জীবনেও এমন অভিজ্ঞতা এসেছে। যখন এলাকার প্রভাবশালী নেতারা ভয়ভীতি দেখাত, তখন স্বাভাবিকভাবেই পরিবার আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। আন্দোলনে না যেতে আমাকে বহুবার বোঝানো হয়েছে। এমনকি আম্মুকে কাঁদতেও দেখেছি। আমাকে ঘরে আটকে রাখার চেষ্টাও হয়েছে। কিন্তু বিবেকের ডাকে, স্বাধীনতার স্বপ্নে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্ববোধে আমি বারবার রাজপথে ফিরে গেছি।
চট্টগ্রাম শহরের একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করার সুবাদে শহরের প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। শুধু রাজপথেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সত্য তুলে ধরার জন্য নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আজও মনে পড়ে, শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে শহরের পথে চলার সময় বিভিন্ন জায়গায় ক্ষমতাসীনদের অনুগত লোকজন আমাদের মোবাইল ফোন তল্লাশি করত। আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট কোনো ছবি, পোস্ট বা তথ্য পাওয়া গেলে তাদের রোষানল থেকে রক্ষা পাওয়াই কঠিন হয়ে যেত। তখন সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে, আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দিতে কত কৌশল যে অবলম্বন করতে হয়েছে, তার অনেক গল্পই আজও অব্যক্ত ইতিহাস হয়ে আছে।
কিন্তু আজ সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে অন্য একটি কারণে। যে জুলাইয়ের আত্মত্যাগের পথ ধরে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, যে জুলাইয়ের কারণে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম হয়েছিল, আজ সেই জুলাইকেই যখন কেউ কেউ আড়াল করতে বা ভুলে যেতে চায়, তখন সত্যিই হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মীর মুগ্ধ, শহীদ ওয়াসিম, শহীদ শান্তসহ অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ, হাজারো আহত সংগ্রামী এবং লাখো মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের ফলেই স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটেছিল। সেই আত্মত্যাগের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আজ নতুন বাস্তবতা, নতুন সম্ভাবনা এবং নতুন নেতৃত্বের পথ তৈরি হয়েছে। তাই প্রশ্ন জাগে—এই জুলাই না হলে আজকের অবস্থান কি আদৌ সম্ভব হতো?
দীর্ঘ সতেরো বছরের নিপীড়ন, দমন-পীড়ন ও হতাশার মধ্যে অনেকেই পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু জুলাই সেই সাহস ফিরিয়ে দিয়েছিল। জুলাই মানুষকে শিখিয়েছিল মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে, ভয়কে জয় করতে।
জুলাই শুধু একটি মাসের নাম নয়; এটি আত্মত্যাগ, সাহস, প্রতিবাদ ও মুক্তির প্রতীক। এটি এমন এক ইতিহাস, যা রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছে। দেয়াল থেকে লেখা মুছে ফেলা যায়, স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। জুলাই সেই ইতিহাস, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে।
যখনই কোনো স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, জুলাই আবার প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ফিরে আসবে। কারণ এই তরুণ প্রজন্ম এখন চোখে চোখ রেখে কথা বলতে শিখেছে। তারা অন্যায়ের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না। তারা জানে, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের জন্য প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ ত্যাগও স্বীকার করতে হয়।
শহীদ ওসমান হাদী ভাইয়ের সেই দৃঢ় উচ্চারণ আজও আমাদের কানে বাজে—
“প্রয়োজনে আমরা জান দেবো, তবুও জুলাই দেবো না।”
ক্ষমতার জোরে হয়তো জুলাইয়ের স্মারকচিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু মানুষের মন থেকে জুলাইকে কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। কারণ এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি আমাদের রক্ত, ত্যাগ, সাহস এবং সংগ্রামের বাস্তব ইতিহাস।
তাই জুলাইকে অস্বীকার নয়, ধারণ করুন। বিদ্বেষ নয়, শিক্ষা গ্রহণ করুন। কারণ যে জাতি নিজের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে ভুলে যায়, সে জাতি ভবিষ্যতের পথও হারিয়ে ফেলে।
পরিশেষে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই এই জেন জি প্রজন্ম বেঁচে থাকতে আমাদের আত্মত্যাগের এই জুলাই'কে অত সহজে মুছে ফেলা যাবে না।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
~ মুহাম্মদ সালমান
শিক্ষার্থী : চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ।
বিবিএ (অনার্স) - ব্যবস্থাপনা - ১৯ তম ব্যাচ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।