আমার দেখা সেরা শিক্ষক ছিলেন সক্রেটিস! না, আমি গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের কথা বলছি না। মুহাম্মদ মফিদুল ইসলাম বি.এস.সি ওরফে সক্রেটিস। বড়দের কাছে শুনেছি, উনি তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে হাটবাজার,চায়ের দোকান যেখানেই পেতেন সেখানেই শিক্ষাদান করতেন এবং সক্রেটিসের একজন ভক্তও ছিলেন; তাই আমাদের ইউ.এন.ও. স্যার একটা প্রোগ্রামে তাঁকে বাংলার সক্রেটিস বলে আখ্যায়িত করেন। আর এই নামে তিনি এতো বেশি পরিচিত হন যে, স্কুলের নতুন শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই তাঁর আসল নাম জানতো না।
ষষ্ঠ শ্রেণির প্রথম ক্লাসে তিনি আমার পরিচয় জানতে চাইলে, আমি হাউমাউ করে কান্না শুরু করি। তৎক্ষনাৎ তিনি আমার কাছে এসে বাবার মতো আদর করে কোলে তুলে নেয় আর বলতে থাকে “আমার পাগল ছেলে; তুমি রাজিবের মতই হয়েছো।” (রাজিব স্যারের ছোট ছেলে,সে তখন আমাদের সাথেই পড়তো।) এ ঘটনার পর থেকে স্যার প্রায়ই আমাকে ডেকে কথা বলতেন,সাহস দিতেন। কিন্তু আমি ছিলাম ইন্ট্রোভার্ট; অন্যের সাথে মিশতেই পারতাম না। কিন্তু স্যারের সঙ্গে আমার একটা খুবই ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠল।
তারপর থেকে আমি প্রায়ই রাজিবের সাথে ওদের বাসায় যেতাম; আর স্যার আমাকে দেখা মাত্রই কাছে ডেকে নিতেন, তাঁর পারিবারিক লাইব্রেরি থেকে একটা বই পছন্দ করে নিতে বলতেন। তারপর সেটা শেষ করে আমি আবারও স্যারের কাছ থেকে আরেকটা বই নিয়ে আসতাম; এভাবেই আমি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎ, বঙ্কিম থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন বই পড়লাম, আর স্যারের সাথে বই নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। স্যার আমার কবিতারও বেশ ভক্ত ছিল, তাই স্যারকে প্রায়ই স্বরচিত কবিতা শুনিয়ে আসতাম। স্যার বলতো, “তোমার লেখা,লেখা হচ্ছে শামীম! লেখা থামিয়ে দিও না।“ এসব শুনে আমি আরও বেশি করে লেখালেখি শুরু করি; এভাবে কেটে যায় ৩টা বছর।
তখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্র। ষান্মাসিক পরীক্ষাতে রসায়নে ফেইল করলাম। রেজাল্ট শুনেই আমি স্যারের কাছে গিয়ে চুপ করে থাকি। পরে স্যার আমাকে নিয়ে তাঁর বাসায় আসে। তারপর তাঁর পারিবারিক লাইব্রেরিতে নিয়ে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি দেখায় ও জীবনের গল্প বলতে থাকে। বিশেষ করে টমাস আলভা এডিসনের গল্পটা আমার কাছে খুব ভালো লাগে এবং আমি নিজের মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পাই। সেদিন বাবার ভয়ে আর বাসায় যাইনি, স্যার বাবাকে কল করে বলে দিয়েছিলেন। জানিনা স্যার বাবাকে কী বলেছিলেন! পরের দিন বাসায় গেলেও বাবা আমাকে তেমন কিছু বলল না। শুধু বলল, “মফিদুল ভাইয়ের সাথে কথা হইছে,উনি কী বলে একটু মান্য করে চলো বাবা।”
তারপর আমি পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী হয়ে উঠি। স্যারের কাছে গিয়ে ম্যাথ শিখি এবং পাশাপাশি তো আলোচনা আছেই। কীভাবে যেন স্যার আমার মধ্যে একটা সম্ভাবনা দেখতে পেতেন! আমাকে স্যার মাঝে মধ্যেই বলতেই, ‘শামীম, আমাদের স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ এখনো পড়তে পারেনি! আমার মনেহয় তুমি সেটা পারবে।” আমি তখন ভাবতাম স্যার আমাকে নিয়ে বেশি বেশি বলে, তিনি আমাকে ভালোবাসেন তাই হয়তো।
তারপর আমি এস.এস.সি. তে সাধারণ একটা ফলাফল করি।স্যার ভেবেছিলেন আমি এ+ পাব আর রাজিব টেনেটুনে এ পাবে। কিন্তু দেখা গেল আমরা দুইজনই ৪.৩৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হলাম। ছেলের ফলাফলে স্যার খুশি ছিলেন কিন্তু আমার ফলাফলে তিনি হতাশ হয়েছিলেন।
কলেজে ভর্তি হলেও আমি সময় বের করে স্যারের বাসায় যাতায়াত করতাম। মনেহচ্ছিল আমি তাঁদের পারিবারের একজন সদস্য। তখনও স্যার আমাকে ডেকে কাছে বসাতেন এবং আগের মতই গল্পের ছলে আমাকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করতেন। "বিশ্ববিদ্যালয় কী? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে নিজের অবস্থান সৃষ্টি করে দেশ গঠনে বৃহত্তম পরিসরে দেশের সেবা করা যায় কি না?" এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন।তখন আমি মনে মনে কল্পনা করতাম, “ইশ!যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারতাম!” যাইহোক কলেজ জীবনে এসে আমি স্যারের আরও বেশি ভক্ত হয়ে যাই। স্যার আমাকে ধীরে ধীরে আবার নার্সিং শুরু করে। তিনি তখন আমাকে বাংলা পড়ানো শুরু করলেন। একটা কথা বলা প্রয়োজন,স্যার ম্যাথের শিক্ষক হলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তিনি মাঝে মধ্যে সৈয়দ হকের(সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক) সঙ্গেও আলোচনা করতেন। সৈয়দ হকও নিজ জন্মভূমিতে(কুড়িগ্রাম) আসলে স্যারকে আড্ডার দাওয়াত দিতেন। অতএব বুঝতেই পেরেছেন স্যার বাংলাটাও বেশ ভালো পড়ান।
উচ্চ মাধ্যমিকের শেষ প্রান্তে চলে আসলাম। পরীক্ষার আগে করোনা মহামারীর কারণে তা পিছিয়ে দেওয়া হলো। তারপরের ঘটনা সবাই জানি! কি আর! অটোপাস! নিজের জীবনের সেরা প্রস্তুতির ফলাফলটা আমি জানতে পারলাম না। ৪.৭৫ জি.পি.এ. এর সঙ্গে হতাশা নামক উপলব্ধি নিয়ে এইস.এস.সি. পাস করলাম।স্যার তখন প্রায়ই বলতো, “পরিশ্রম কখনো বৃথা যায়না, শামীম। এই পরিশ্রমের ফলেই তুমি অনেক ভালো কিছু করবে ইন শা আল্লাহ।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিটাও স্যারের হাত ধরেই শুরু করলাম, কেননা করোনা মহামারীর কারণে সব অফলাইন কোচিং বন্ধ। আর আমার কোনো মোবাইল ফোন না থাকায় অনলাইনেও কোচিং করা সম্ভব নয়। স্যার আমাকে আর রাজিবকে পড়াতে গিয়ে আগের রাতে তিনি প্রচুর পড়াশোনা করতেন আর পরেরদিন আমাদের পড়াতেন। বলতে গেলে স্যারই মনেহয় ওই সময়টা আমাদের থেকে বেশি পড়াশোনা করেছিলেন। স্যার প্রত্যেকটা টপিক অনেক সুন্দর করে আমাদের জন্য প্রস্তুত করতেন। আর এদিকে আমি আর রাজিবও তুমুল পড়াশোনা করতে থাকি। এরকম একজন আদর্শ শিক্ষক থাকলে বিবেকবান ছেলেরা পড়াশোনা না করে পারে!
করোনা মহামারীর কারণে এভাবেই বহুদিন ভর্তি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করলাম। স্যারের ফোনে অনলাইনে ২/১টা পরীক্ষা দিলে দেখলাম যে, অনেক বাঘা বাঘা ছাত্র আমার ও রাজিবের পিছনে। তখন স্যার বলতো, “এভাবে পড়লে তোমাদের ঢাবিতেই হবে ইন শা আল্লাহ।”
পরীক্ষা চলে আসলো; ঢাবিতে আমি প্রথম পরীক্ষা দিলাম। এমসিকিউ খারাপ হওয়ায় আমি পরীক্ষার হলেই হাল ছেড়ে দিই এবং রিটেন লিখতে গিয়ে কাঁদতে থাকি। তারপর বাইরে এসে শুনি সবারই এমসিকিউ খারাপ হয়েছে। স্যার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি বের হয়েই স্যারকে দেখে কান্না জুড়ে দিই এবং সব খুলে বলি। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য ভালো লাগে,কেননা রাজিব বেশ ভালো পরীক্ষা দিয়েছে। সেদিন স্যার আমাকে খুব করে বুঝালেন যে, আরও অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় আছে; তুমি সেগুলোতে ভালো করবা ইন শা আল্লাহ। এভাবে এক এক করে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। প্রথমেই আমি ও রাজিব রাবিতে চান্স পেলাম। এলাকায় হৈ হৈ রৈ রৈ উঠে গেল। তিনি এতোদিন সত্যিই ২ জনকেই তার সন্তানের স্নেহে আগলে রেখেছেন। তাইতো দুই সন্তানের সাফল্যে তিনি আনন্দে আত্মহারা। আমার আব্বাকে বললেন, “সাইফুর তোকে বলেছিলাম না, শামীম ভালো করবে!”
কিন্তু এই আনন্দ আর বেশিদিন রইল না! রাবির রেজাল্টের ১ সপ্তাহ পরে স্যারের হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেল। এলাকার সক্রেটিস,হাজারও জনের প্রিয় ব্যক্তিত্ব,আমার প্রিয় শিক্ষক মফিদুল স্যার আর রইলেন না। আমাদের সংকীর্ণ জ্ঞানকে পূর্ণতাদানের মানুষটিকে আমরা হারিয়ে ফেললাম। তারপর আমি আর রাজিব লাইব্রেরিতে বসলে কান্না ছাড়া কখনো বই পড়তে পারিনি।
ধীরে ধীরে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজাল্ট হতে থাকে। রাজিবের ঢাবিতেও চান্স হয়,আমি ওয়েটিংয়ে থাকি। বাকিগুলোতে আমাদের ২জনেরই চান্স হয়। কিন্তু আমাদের জীবনে আর আনন্দ আসে না; সব আনন্দ সক্রেটিস মশাই নিয়ে চলে গেছেন। হয়তো আনন্দ নামের ডোপামিনটা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই হেমলক পান করেছে!
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।