#একটি_নিরপেক্ষ_ও_যুক্তিসঙ্গত_আলোচনা
#গৌতম_বুদ্ধ_নাস্তিক_ছিলেন_নাকি_আস্তিক_ছিলেন?
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
© প্রিন্স ফ্রেরাসে
এক নজরে পয়েন্ট -
১. নাস্তিকতা আসলে কি
২. ত্রিপিটক থেকে স্রষ্টার প্রমাণ
৩. গৌতম বুদ্ধের স্রষ্টাতে বিশ্বাসের প্রমাণ ত্রিপিটক থেকে
৪. দেবতাদের প্রমাণ ত্রিপিটক থেকে
৫. স্বর্গ ও পূর্নজন্ম এর প্রমাণ ত্রিপিটক থেকে
৬. কর্মফল বা নিয়তির প্রমাণ ত্রিপিটক থেকে
৭. গৌতমকে কেন নাস্তিক বলা হয়?
আমার পুরাতন আইডি নষ্ট হওয়ার কারণে এই বিষয়ে আগের লেখাটা শেষ হয়ে যায়, আর এই বিষয়ে অনেকে প্রশ্ন করেন আর আমি অনেকে সাথে তর্ক করেছি। তাই এই পয়েন্ট এতে একটা লিখিত পোস্ট রাখা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে আবারও লেখা শুরু করলাম। আমাদের সমাজে ৯০% এমনকি স্বয়ং বর্তমান বৌদ্ধদের বড় অংশ মনে করে যে ত্রিপিটকে স্রষ্টার কথা বলা হয় নি এবং গৌতম বুদ্ধও স্রষ্টাতে বিশ্বাস করত না! । তাই আমি আজকে ত্রিপিটক থেকে স্রষ্টার প্রমাণ করব এবং আরও লেখাতে দেখাব যে গৌতম বুদ্ধ একজন আস্তিক ও ইশ্বরে বিশ্বাসি ছিলেন। এখন সেটাই সাবিত ( প্রমাণ) করে দেখাবো ইনশাআল্লাহ৷
তো চলুন শুরু করা যাক ।
পয়েন্ট -১
প্রথমে আসি বর্তমানে নাস্তিক বলতে আসলে কি বুঝায়। এই বিষয়ে বাংলা ভাষায় নাস্তিকদের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট " সংশয় ডট কম " এতে বলা হয়েছে যে -
" নাস্তিক্যবাদ আসে যুক্তিবাদ থেকে। নাস্তিকতা কোন ধর্ম নয়, বরঞ্চ বেশিরভাগ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মৌলিক দাবী, অতিপ্রাকৃতিক সত্ত্বার অস্তিত্বে অবিশ্বাস। যাবতীয় বিশ্বাস, ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মতত্বকে যাচাই বাছাই এবং যুক্তিসঙ্গত উপায়ে বাতিলকরণ। “মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঈশ্বর আছে বা কোন অলৌকিক শক্তি আছে তার কোন উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ নেই”। এবং যেহেতু কোন প্রমাণ নেই, তাই ঈশ্বরের এই দাবীকে নাস্তিক্যবাদ বাতিল করে এবং ভ্রান্ত বলে মনে করে। "
তো এখান থেকে আমরা বর্তমানে নাস্তিক হওয়ার তিনটা বৈশিষ্ট্য পেলাম-
১.ধর্মের মৌলিক বিষয় বিশ্বাস করে না
২. তারা ইশ্বরে বিশ্বাস করে না
৩. অতিপ্রাকৃত কোনো বিষয়ে বিশ্বাস করে না
" আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো এরা যুক্তি বা যাছাই করে!
এখন যদি কোনো মানুষের মধ্যে এই তিনটার কোনো এক বিশ্বাস পাওয়া না যায় তাহলে নাস্তিকদের মতে " উক্ত ব্যক্তি বা দল নাস্তিক না বরং আস্তিক। এখন আমরা দেখব যে গৌতম বুদ্ধ একজন স্রষ্টাকে মান্য করত এবং অতিপ্রাকৃত বিষয়েও স্বীকৃত দিয়েছে।
পয়েন্ট-২
তো আমরা প্রথমে ত্রিপিটকে দেখব যে ইশ্বরের কথা বলা হয়েছে কিনা বা সৃষ্টিকর্তা এর উল্লেখ আছে কি না। এই বিষয়ে ত্রিপিটকে স্রষ্টা নিজ সম্পর্কে বলে -
" ৪৯৫. মহাব্রহ্মা ভিক্ষুকে বলিলেন, “হে ভিক্ষু, আমি ব্রহ্মা, মহাব্রহ্মা, বিজয়ী, অপরাজিত, সর্বদর্শী, সর্বশক্তিমান, ঈশ্বর, কর্তা, নির্মাতা শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা, ভূত ও ভক্ষ্যের শক্তিমান পিতা।”
( রেফারেন্স : ত্রিপিটক - সূত্রপিটকে দীর্ঘনিকায়, শীল স্কন্ধ বর্গ, কেবদ্দ সূত্র, শ্লোক নং -৪৫৯)
তো দেখুন ত্রিপিটকে স্বয়ং ইশ্বর ( ব্রহ্মা/ সৃষ্টিকর্তা) নিজেই নিজের পরিচয় সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছে, তাই যেসব মূর্খ বলে ত্রিপিটকে স্রষ্টার ব্যাপারে বলা নেই তারা কখনো বৌদ্ধ শাস্ত্র ( ত্রিপিটক) পড়েই দেখি নি বলে আমরা মনে করি... । এরকম আরও অসংখ্য প্রমাণ দেওয়া যাবে ত্রিপিটক থেকে স্রস্টার ব্যাপারে, কিন্তু জ্ঞানীদের জন্য আমি এতটুকুই যথেষ্ট মনে করি...... ।
পয়েন্ট -৩
তো এখন আমরা ত্রিপিটক হতে দেখে নিবো যে গৌতম বুদ্ধ ত্রিপিটকে ইশ্বরের সম্পর্কে কি বলেছে। গৌতম বুদ্ধ বলেন-
" ৩৩৯. তখন আমি মহাব্রহ্মা সোহংপতির আরাধনা বিদিত হইয়া জীবগণের প্রতি করুণাবশত বুদ্ধচক্ষু দ্বারা জীব-জগৎ বিলোকন করি। বুদ্ধ-দৃষ্টিতে বিশ্ব বিলোকন করিয়া আমি স্বল্পরজ মহারজ তীৰ্নিন্দ্রিয়, মৃদু ইন্দ্রিয়, সু-আকারবান, সুবোধ এবং পরলোক ও দোষের প্রতি ভয়দর্শী হইয়া অবস্থানকারী কোনো কোনো সত্ত্বগণকে দেখিতে পাইলাম..."
( রেফারেন্স : সূত্রপিটকে মধ্যমনিকায়, মধ্যম-পঞ্চাশ, ৪. রাজ বর্গ ১. ঘটিকার সূত্র, বোধি রাজকুমার সূত্র
বুদ্ধ-জীবনী (গৃহত্যাগ হইতে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি পর্যন্ত), শ্লোক-৩৩৯)
অনুবাদক : শ্রীমৎ ধর্মাধার মহাস্থবির)
লক্ষ্য করুন যে এখানে বৌদ্ধ কিভাবে বৌদ্ধত্ব লাভ করেছে তা নিজের মুখে বলছে, আর সে এটা প্রথমেই বলেছে যে সে মহাব্রহ্মা ( ইশ্বর ) এর মাধ্যমেই সত্য জ্ঞান লাভ করেছে..... । অর্থাৎ গৌতম ইশ্বরের মাধ্যমেই এই বুদ্ধত্ব লাভ করেন। তাই যেসব বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারী দাবিদার বলে যে গৌতম ইশ্বরে বিশ্বাসি ছিল না তারা গোমরাহ বা পথভষ্ট ।
[ "বোধি রাজকুমার সূত্রবুদ্ধ-জীবনী (গৃহত্যাগ হইতে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি পর্যন্ত) " আপনারা এই প্যারা পুরোটিকু পড়লে আরও স্পষ্ট বুঝতে পারবেন যে গৌতম বুদ্ধ পিওর ইশ্বরে বিশ্বাসি ছিল আর সে তার প্রসংশাও করেছে....]
এছাড়াও ত্রিপিটক থেকে আমরা এটাও বুঝতে পারি যে গৌতম যে ইশ্বরে বিশ্বাস করত সে নিরাকার ( ত্রিপিটকের সূত্রপিটক, দীর্ঘনিকায়, তেবিজ্জ্ব সূত্র, বহ্মজ্ঞান, শ্লোক-৫২৩)
[ উল্লেখ্য যে আমি চাইলে ত্রিপিটক থেকে এটাও প্রমাণ করে দেখাতে পারব যে ইশ্বর সাকার..... ]
তো এরকম ভাবে আমরা ত্রিপিটক থেকে ইশ্বরের পক্ষে ১০০+ রেফারেন্স দাড় করাতে পারব ইনশাআল্লাহ , আমি শুধু এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে পয়েন্টে আলোচনা করার জন্য মাত্র এক দুটো রেফারেন্স ব্যবহার করেছি। আপনারা ত্রিপিটক পড়লে ইশ্বর সম্পর্কে ভুঁড়ি ভুড়ি প্রমাণ পাবেন....... ।
পয়েন্ট -৪
তো ঘটনা এখানেই শেষ নয়! ত্রিপিটকে দেবতা এর কথাও আছে, মানে হিন্দুদের যেমন দেবতা আছে তারা একেক জনে একেক কাজে নিয়েজিত তেমনি বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারেও দেবতা আছে আর তারা একেক কাজে নিয়োজিত। এখন আমরা এরকম একটা প্রমাণ পেশ করছি -
"১৬৩. তখন অন্যতর মিথ্যাদৃষ্টিক মারপক্ষপাতী দেবতা জল হতে উঠে এসে মৃগলণ্ডিককে এরূপ বলতে লাগল : “সাধু, সাধু, সৎপুরুষ তোমার অনেক লাভ হয়েছে, তোমার বহু সুলব্ধ হয়েছে। তোমার দ্বারা অনেক পুণ্য সঞ্চিত হয়েছে, কারণ তুমি অতীর্ণদেরকে তীরে পার করে দিয়েছ, দুঃখ হতে নিষ্কৃতি দিয়েছ।” ( বিনয়পিটকে তৃতীয় পারাজিকা, শ্লোক নং- ১৬৩)
দেবতাদের ব্যাপারেও আরও বলা আছে এবং বিভিন্ন দেবতা সম্পর্কেই উল্লেখ আছে। সংক্ষিপ্ত আকারে শেষ করার জন্য আমি একটা রেফারেন্স দিলাম।
পয়েন্ট -৫
তো এই ঐচ্ছিক পয়েন্ট এতে কিছু আলাদা বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। এখন আসি বৌদ্ধ ধর্মে পূনর্জন্ম বা পূর্বজন্ম, স্বর্গ ( জান্নাত) এর রেফারেন্স নিয়ে। আমি শুধু এখানে রেফারেন্স পেশ করছি আপনারা ত্রিপিটক চেক করে দেখবে পারেন । রেফারেন্স -
" বিনয় পিটকে পারাজিকা, বৈরঞ্জ অধ্যায়, শ্লোক-১২ - এখানে পূনর্জন্ম এর কথা বলা হয়েছে... এবং আরও দেখুন- " দীর্ঘনিকায়, শীলস্কন্ধ বর্গ, শ্রামণ্যসূত্র, শ্লোক-১৬৮ "
বৌদ্ধ ধর্মে স্বর্গের কথা বলা হয়েছে -" বিনয়পিটক, তৃতীয় পারাজিকা, শ্লেক-১৬৬-১৬৭ "
এখন নাস্তিকদের কাছে আমার প্রশ্ন, যে ধর্মে স্বর্গ, পূর্বজন্ম এসবের কথা বলা আছে আর যে এগুলো বলে সে বা তার ধর্ম কি নাস্তিক নাকি আস্তিক?
পয়েন্ট -৬
বৌদ্ধ ধর্মের কর্মফল বা নিয়তি এর কথাও বলা আছে, এই ব্যাপারে জানতে দেখুন- " ত্রিপিটকের সূত্রপিটক, দীর্ঘনিকায়, শীল স্কন্ধ বর্গ, শ্রামণ্যফল সূত্র, শ্লোক-১৬৮ "
তো আমরা বুঝতে পারলাম যে বৌদ্ধ ধর্মের ও গৌতম বুদ্ধও নিয়তি এর কথা স্বীকার করেছে, আর তার অনেক অনুসারীরা নাস্তিকদের সাথে সুর মিলিয়ে নিজ ধর্মকে আধুনিক ও যুক্তিবাদ ধর্ম প্রমাণ করতে গিয়ে বলে যে বৌদ্ধ ধর্মে নাকি এগুলো এগুলো নেই! যা হাস্যকর দাবি ছাড়া কিছুই না......
তো আমার এই পয়েন্ট আলোচনার মাধ্যমে এটা সাবিত হলো যে গৌতম বুদ্ধের ধর্মেও অতিপ্রাকৃত বিষয় আছে ( নাস্তিকদের মতে যেগুলোর প্রমাণ নেই) তাই তাদের উচিত হবে না গৌতমকে নাস্তিক বলা.....
পয়েন্ট -৭
এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে গৌতম বুদ্ধ বা তার ধর্ম আস্তিক হলে নাস্তিক কেন বলা হয়?
তো এর জবাবে আমাকে বলতে হবে যে গৌতম ইশ্বরে বিশ্বাস করলেও এবং এর সাথে সাথে ধর্মীও অলৌকিক বিষয়গুলোতে বিশ্বাস করার পর তাকে নাস্তিক বলার কারণ হলো সে তার সময়ে ব্রাহ্মণ ও তাদের বেদের বিরোধীতা করেছে। আর হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে নাস্তিক( মনুসংহিতা -২/১১-১৩; সামবেদ-১৩৪৩) আর সনাতন ( হিন্দু ) আর্য পন্ডিত দয়ানন্দ সরস্বতীও বলেছে যে বেদ বিরোধী ব্যক্তি নাস্তিক ( সতার্থপ্রকাশ-৩/৫১; ১১/২৮৪) আর গৌতম বুদ্ধ সে সময় বেদের বিপক্ষে যাওয়ার কারণেই তাকে নাস্তিক আখ্যায়িত করা হয়েছে, স্রষ্টাকে অস্বীকার করার জন্য তাকে নাস্তিক বলা হয় নি.....
আশা করি বুঝতে পেরেছেন।
তো এই ছিল সংক্ষিপ্ত একটা পর্যালোচনা, আশা করি এই বিষয়ে অনেকের তেমন জানা ছিল না বা জানা থাকলেও রেফারেন্স জানা ছিল না, অথবা রেফারেন্স জানা থাকলেও যুক্তি তথ্য উপস্থাপন করার বিষয় জানা ছিল না... তো তারা জানেন না তাদের জন্যই এই পোস্ট!
[ উল্লেখ্য যে লেখাটা আগে নিজের মতো লেখেছি, তো যারা পোস্ট এর শিরোনামের বিষয়টা শুধু জানতে চান তাদের জন্য পরে এখন পয়েন্ট ভাগ করে দিলাম, আপনারা তৃতীয় পয়েন্ট দেখুন,আর আরেকটু জানতে চাইলে দ্বিতীয় পয়েন্ট ও দেখুন ]
যাইহোক, সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন
লেখক: মোঃ মেহেদী হাসান ✍️
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।