২১ জুলাই ২০২৫, দুপুর ১টা ১৮ মিনিট। ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ছুটির ঘণ্টা বাজার ঠিক পরপরই ঘটে গেল এক নারকীয় বিপর্যয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান F-7BGI আছড়ে পড়ল স্কুলের ভবনে, মুহূর্তে শত শত শিশুর জীবনকে ঠেলে দিল এক ভয়াবহ আগুনের মুখে। এই ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে আমাদের সামনে এলেও, এর পেছনের সত্যগুলো এক গভীর এবং পরিকল্পিত "রাষ্ট্র স্তরের অপরাধ" এর দিকে ইঙ্গিত করে। এই লেখাটি সেই দুর্ঘটনার আড়ালে থাকা চারটি ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করবে, যা বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার চেয়েও অনেক বেশি মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক।
১. পাইলটের ভুল নয়, এটি ছিল সিস্টেমের তৈরি এক অবশ্যম্ভাবী ফাঁদ
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম তার জীবনের প্রথম একক উড্ডয়নে (solo flight) ছিলেন। তাকে মাত্র ১,৫০০ ফুট উচ্চতায় বিমান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যা বিপজ্জনকভাবে কম। উড্ডয়নের তৃতীয় রাউন্ডের সময় তাকে একটি যাত্রীবাহী বিমানকে পথ করে দেওয়ার জন্য কম গতিতে প্রায় পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়, কারণ বিমানবন্দরে রানওয়ে মাত্র একটি। এই কম গতি এবং কম উচ্চতার সংমিশ্রণেই তার বিমানটি সম্ভবত "স্টল মোডে" চলে যায়, যেখানে বিমানের ডানাগুলো বাতাসে ভেসে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি হারিয়ে ফেলে।
এই স্টল মোড থেকে বিমানকে পুনরুদ্ধার করাও তৌকিরের জন্য ছিল এক অসম্ভব বিষয়। সাধারণত, স্টল থেকে বিমানকে বের করে আনার জন্য "নোজ ডাইভ" (Nose Dive) বা বিমানের নাক খাড়াভাবে নিচের দিকে নামিয়ে আনার প্রয়োজন হয়, কিন্তু এই প্রক্রিয়াটির জন্য ন্যূনতম ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ ফুট উচ্চতা দরকার। তৌকিরের হাতে ছিল ১,০০০ ফুটেরও কম। এই উচ্চতায় স্টল থেকে বিমান পুনরুদ্ধার করা ছিল একেবারেই অসম্ভব। তাই তার শেষ মুহূর্তের প্রাণপণ চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য ছিল। এটি কোনো সাধারণ পাইলটের ভুল ছিল না, বরং এটি ছিল ফ্লাইট টেস্ট ডিজাইনের একটি পদ্ধতিগত ব্যর্থতা।
এখানে প্রশ্ন ওঠে: কে একজন পাইলটের প্রথম একক উড্ডয়নের পরীক্ষা ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর, এমন কম উচ্চতায় এবং একটি মাত্র ব্যস্ত রানওয়ে ব্যবহার করে ডিজাইন করেছিল? এই সিদ্ধান্তই তৌকিরকে এক অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর ফাঁদে ফেলে দিয়েছিল।
২. বিমানটি যেখানে বিধ্বস্ত হয়, সেই স্কুলটি সেখানে থাকারই কথা ছিল না
যেকোনো বিমানবন্দরের রানওয়ের সামনে এবং পেছনে ৯ থেকে ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি এলাকাকে "অ্যাপ্রোচ ফানেল" বলা হয়। এটি একটি আইনিভাবে সুরক্ষিত করিডোর, যেখানে কোনো উঁচু ভবন, স্কুল, হাসপাতাল বা জনবহুল স্থাপনা থাকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিমানগুলো নিরাপদে ওঠানামার জন্য এই এলাকাটি বাধামুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক। অথচ মাইলস্টোন স্কুলটি বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে, ঠিক এই অ্যাপ্রোচ ফানেলের কেন্দ্র বরাবর নির্মাণ করা হয়েছিল। এর ফলে বিমানগুলোকে ভবনের এতটাই কাছ দিয়ে উড়ে যেতে হতো যে, দূরত্ব থাকত "হয়তো ২০ বা ২৫ ফুট"। আইন অনুযায়ী, যে জায়গায় শত শত শিশু একসঙ্গে থাকে, তেমন একটি স্কুল এই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থাকার কোনো কথাই ছিল না।
এই ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার পেছনে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের লাগামহীন দুর্নীতি।
• প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ লাইনে প্রায় ৫২৫টিরও বেশি অবৈধ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
• ঘুষ বাণিজ্য সহজ করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ডিজিটাল পারমিটিং সিস্টেম বন্ধ করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কাজ করা হয়েছে।
• একজন রাজউক ক্লার্ক, যার মাসিক বেতন ৩৫,০০০ টাকা, তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি টাকার বেশি, যা দুর্নীতির গভীরতাকে স্পষ্ট করে।
• ২০২২ সালে রাজউকের সার্ভার থেকে ৩০,০০০ মানুষের তথ্য গায়েব হয়ে যায়, যা নিয়ে হাইকোর্টকে পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে মাইলস্টোন স্কুলের মতো একটি স্থাপনা গড়ে ওঠা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক পচনের ফল।
৩. 'আধুনিকায়নের' নামে কেনা হয়েছিল বাতিল 'উড়ন্ত কফিন'
বিধ্বস্ত হওয়া F-7BGI বিমানটি ছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি যুদ্ধবিমান। এই মডেলটি এতটাই পুরোনো যে বিশ্বব্যাপী এর উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। "ফোর্সেস গোল ২০৩০" নামক আধুনিকায়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাংলাদেশই ছিল এর শেষ ক্রেতা, যারা ২০১১ সালে বিশেষ অনুরোধে এর শেষ ব্যাচটি তৈরি করিয়ে নেয়। এই ঘটনাটি এক চরম পরিহাসের জন্ম দেয়। উৎসের বর্ণনানুযায়ী, এটি অনেকটা এমন যে, "আপনি আপনার সন্তানকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জন্য প্রস্তুত করতে তার হাতে একটি নোকিয়া ১১০০ ফোন তুলে দিলেন।" ভবিষ্যতের জন্য বিমানবাহিনীকে আধুনিক করার নামে এমন একটি বাতিল মডেল কেনা হয়েছিল, যার বিশ্বজুড়ে দুর্নাম ছিল 'উড়ন্ত কফিন' হিসেবে।
এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বিচ্ছিন্ন ছিল না, এর পেছনে রয়েছে প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ব্যাপক দুর্নীতি। ২০২০ সালের গভর্নমেন্ট ডিফেন্স ইন্টিগ্রিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৮৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে। অভিযোগ রয়েছে, বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান আব্দুল হান্নান একাই ৩,০০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা ছিল তিন বছরের মোট বাজেটের ২৫%। এই দুর্নীতির মূল উৎস সম্পর্কে একটি শক্তিশালী উদ্ধৃতি হলো:
যেকোনো পারচে যে দুর্নীতি রাজনৈতিক পর্যায় থেকেই শুরু হয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়া এমন দুর্নীতি সম্ভবই না। তাদের প্রভাবের কারণেই এক টাকার জিনিস ১০ টাকায় কিনতে হয়।
৪. ব্ল্যাক বক্স গায়েব, তদন্ত ধামাচাপা: আসল সত্য কি কখনো জানা যাবে?
ব্ল্যাক বক্স (ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার ও ককপিট ভয়েস রেকর্ডার) হলো একটি বিমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা দুর্ঘটনার আসল কারণ উদঘাটন করতে পারে। পাইলটের শেষ মুহূর্তের কথাবার্তা এবং বিমানের কারিগরি সব তথ্য এখানেই রেকর্ড থাকে এবং এটি ১১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও টিকে থাকার জন্য ডিজাইন করা হয়। মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পর বিমানটির ব্ল্যাক বক্স পাওয়া গেছে কি না বা এর তথ্য কী ছিল, তা নিয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করা হয়েছে। কোনো গণমাধ্যমও এই অকাট্য প্রমাণটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, যা এক ধরনের পরিকল্পিত তথ্য গোপনের দিকেই ইঙ্গিত করে।
ঘটনার পর আপিল বিভাগের বিচারপতির সমান ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় এবং চার সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সূত্রানুযায়ী, ২৬ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেও কোনো রিপোর্ট জমা দেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি একটি প্রাথমিক রিপোর্টও প্রকাশ করা হয়নি, যা ব্ল্যাক বক্সের তথ্য পেলে মাত্র দুই সপ্তাহেই তৈরি করা সম্ভব। এই নীরবতা প্রমাণ করে যে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যেমনটি একজন বলেছিলেন:
আপনারা ব্লক বক্সের লাস্ট কি কমিউনিকেশন করা আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি এটা তারা কখনো প্রকাশ করবে না।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল নগর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ক্রয় এবং সবশেষে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জমে থাকা গভীর প্রাতিষ্ঠানিক পচনের এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। যে ঘটনা অসংখ্য শিশুর জীবন কেড়ে নিল, সেই ঘটনাও যদি স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়: আর কোন বিপর্যয় আমাদের ঘুম ভাঙাবে?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।