১.
নাঈম, রাঈম আর সাঈম। মধ্যবিত্ত পরিবারের তিনজন সন্তান। ছোটবেলা থেকেই তিনজনের ভালো স্টুডেন্ট হিসেবে এলাকায় খ্যাতি ছিল।
সাঈম ক্লাস ৬-৭ এ থাকতে ফোন হাতে পায়। নাঈম আর রাঈম তখনো ফোন হাতে পায়নি। সাঈমের যখন অনলাইন দুনিয়া বিচরণ করা শেষ। নাঈম আর রাঈমের তখন অনলাইন সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।
এসএসসিতে আশানুরূপ একটা রেজাল্ট করার পর নাঈম আর রাঈম ফোন হাতে পায়। ফোন পাওয়ার পর হঠাৎ তাদের মাথায় উদয় হয় তারা বাইরে পড়ার বদলে অনলাইনেই নিজেদের পড়ালেখা চালিয়ে যাবে।
সাঈম ফোন থাকলেও বাইরেই পড়তো। সে যথারীতি অফলাইনে পড়ালেখা করতে থাকে। বিভিন্ন কোচিং-প্রাইভেট এবং কলেজ টিচারের কাছে পড়ে।
নাঈম আর রাঈমও পড়ালেখা করতে থাকে। অনলাইনে বিভিন্ন প্রথিতযশা টিচারের কোর্স কিনে ক্লাস শুরু করে।
লং স্টোরি শর্ট, এডমিশন আসে। সাঈম একটা প্রথিতযশা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়। নাঈম আর রাঈমের কোথাও চান্স হয় না।
২.
চান্স পাওয়া বা না পাওয়ার পিছনে ভাগ্য-পরিশ্রমসহ বিভিন্ন ফ্যাক্টর আছে। আমি সেদিকে যাব না বরং একটু ভিন্ন দিকে আলোকপাত করবো। সাঈম যেহেতু ক্লাস ৬-৭ এ থাকতে ফোন হাতে পায়। সেসময় অনলাইন দুনিয়া নিজের মতো এক্সপ্লোর করার সুযোগ পেয়েছে। ভালো মন্দ বুঝতে শিখেছে। এবং সর্বোপরি ফোনকে সে আহামরি কিছু মনে করেনি।
উপরদিকে নাঈম আর রাঈম ফোন হাতে পায় এসএসসি পাস করার পর। তাদের হাতে ছোটবেলায় ফোন দেয়া হয়নি। তাই ফোন হাতে পাওয়ার পর তারা এটাকে অনেক বড় কিছু মনে করেছে। যেহেতু ছোটবেলায় ফোন হাতে পায়নি সেহেতু হাতে পাওয়ার পর তারা দেদারসে ব্যবহার করেছে। সবকিছু নিজের মতো এক্সপ্লোর করেছে। এই এক্সপ্লোর করার গ্যাড়াকলে তাদের অনেককিছু ক্ষোয়া গেসে। তাদের পড়াশোনার উদ্দেশ্য ফোন ব্যবহারের চেয়ে অন্যান্য উদ্দেশ্য ফোন ব্যবহার করতেই বেশি দেখা গেসে। পড়াশোনা যদি করেছে ২ ঘন্টা, সোশ্যাল মিডিয়াসহ অন্যান্য বিষয়ে সময় ব্যায় করেছে ৪ ঘন্টা। বড় ভাইয়েরা পরামর্শ দিয়েছে যে বেশি ফোন ব্যাবহার করা যাবে না। কে শুনে কার কথা। যে ছেলে তার বুঝ হওয়ার পর জীবনের ১০-১২ বছর ফোন ধরতে পারেনি সে ফোন হাতে পাওয়ার পর চালাবে না তো কে চালাবে?
৩.
অনেক বাবা মা মনে করেন যে ছোটবেলায় ফোন দেয়া হলে বাচ্চাকাচ্চা নষ্ট হয়ে যাবে। ব্যাপারটা ভুল। যে নষ্ট হওয়ার সে ছোটবেলায় ফোন পেলেও হবে আবার না পেলেও হবে। বয়স এবং ফোন এখানে ম্যাটার করে না। ম্যাটার করে পারিবারিক শিক্ষা এবং তার বিবেকবোধ।
আমি এমন অনেককেই চিনি যারা ছোটবেলায় ফোন হাতে পেয়েছে। বর্তমানে ফোনকে তারা বিশেষ কিছু মনে করে না। আবার যাদের ছোটবেলায় ফোন চালানোর ক্রেভিং ছিল। কিন্তু ফোন হাতে পায়নি তাদের অনেকেকেই ফোনকে হাতিঘোড়া মনে করতে দেখেছি। ফলস্বরূপ এটাকে হাতে পাওয়ার পর তাদের লাগাম নিজেদের হাতে থাকেনি বরং ফোনের হাতে চলে গেসে। ফোনই তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
৪.
আমি বাচ্চাদের ছোটবেলায় ফোন দেওয়ার পক্ষে এবং ছোটবেলায় ফোন যদি না পেয়ে থাকে তবে ইন্টারমিডিয়েট এর আগে বা এইচএসসির পরে ফোন দেওয়ার ঘোর বিপক্ষে। বাচ্চাদের ৪-৫-৬-৭-৮-৯যেকোনো ক্লাসে ফোন দেয়া যেতে পারে। কিন্তু ফোন না পেয়ে থাকলে তাকে এইচএসসির পর এবং ইন্টারমিডিয়েটের আগে কোনোভাবেই দেয়া যাবে না। একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর দিলে ভালো।
৫.
মা-বাবাদের উপর আমার রাগ আছে। তারা সন্তানদের ভালো মনে করে ফোন দেয় ১০ম শ্রেণী বা এসএসসির পর। এইটাতে ভালোর বদলে খারাপ হয়। ফোনটা যদি ২-৩ বছর আগে দিত বা ২-৩ বছর পরে দিত তাহলে অনেক ঝুকি এড়ানো যেত।
৬.
অনলাইন ক্লাস করার ক্ষেত্রে আমার মতামত হইলো অনলাইন ক্লাস ভালো। বিভিন্ন ট্র্যডিশনাল টিচারের চেয়েও অনলাইনের টিচাররা ভালো পড়ায়। তবে অনলাইন ক্লাস করার ক্ষেত্রে একটা শর্ত আছে-
ব্যাবহারকারীকে অবশ্যই ক্লাস শুরু হওয়ার কমপক্ষে ২-৩ বছর আগে ফোন দিতে হবে। জীবনে সদ্য ফোন পেয়েছে এমন কারো দ্বারা অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব নয়। সে নিশ্চিত পথভ্রষ্ট হবে। তার আশাভঙ্গ হবে।
এই শর্ত পূরণ করতে না পারলে বাইরে অফলাইনে পড়তে হবে।
সাঈমের মতো ছেলেরা চাইলে অফলাইন- অনলাইন দুই জায়গাতেই পড়তে পারে। আর নাঈম আর রাঈমের মতো যারা সদ্য ফোন হাতে পেয়েছে তাদের মাস্ট অফলাইনে পড়তে হবে। না হলে গতি নাই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।