পর্ব ৬৩: হারিয়ে যাওয়া নাম ( কেস ৪: অঘোরী রুদ্র ছায়া)
কেস ৪: অঘোরী রুদ্রের ছায়া
পর্ব ৪০: হারিয়ে যাওয়া নাম
মারুফ ও শাহীনুর দ্রুত লাইব্রেরির বাইরে ছুটে গেলেন।
জঙ্গলের ভেতর তখন শুধু শুকনো পাতার শব্দ।
কিন্তু কাউকে দেখা গেল না।
মাটিতে জুতার অস্পষ্ট ছাপ।
মেহেদী হাঁটু গেড়ে ছাপগুলো পরীক্ষা করল।
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"দৌড়ায়নি।"
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"কীভাবে বুঝলি?"
"যদি দৌড়াত, গোড়ালির চাপ আরও গভীর হতো।"
"সে খুব শান্তভাবে হেঁটেছে।"
"মানে..."
"...সে জানত আমরা তাকে ধরতে পারব না।"
---
এদিকে বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান কাঁপা হাতে পানি খেলেন।
মেহেদী তার সামনে একটি চেয়ার টেনে বসল।
"আপনি একটু আগে বলছিলেন, দুই কিশোরকে ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।"
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
"হ্যাঁ।"
"একজন মাহির।"
"আর অন্যজন?"
বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।
"আমি নামটা পুরো মনে করতে পারছি না।"
"তবে..."
"...নামের শুরু 'ম' দিয়ে ছিল না।"
---
মিতু বলল,
"আপনি কি তাদের মুখ মনে করতে পারেন?"
বৃদ্ধ ধীরে তাকালেন মেহেদীর দিকে।
তারপর দীর্ঘক্ষণ কিছু বললেন না।
শেষ পর্যন্ত ফিসফিস করে বললেন,
"তোমাকে দেখে..."
"...বারবার সেই ছেলেটার মুখ মনে পড়ছে।"
ঘরে আবার নীরবতা।
---
ঠিক তখনই বৃদ্ধ বুকশেলফের নিচ থেকে একটি মরিচা ধরা টিনের বাক্স বের করলেন।
"আগুনের রাতে আমি এটা লুকিয়ে রেখেছিলাম।"
বাক্স খুলতেই দেখা গেল...
কিছু পুরোনো ছাত্র পরিচয়পত্র।
কয়েকটি ক্লাসের উপস্থিতির রেজিস্টার।
আর একটি গ্রুপ ফটো।
---
মিতু সাবধানে ছবিটা পরিষ্কার করল।
এবার ছবিতে স্পষ্ট দেখা গেল...
ড. আরিফ সালেহ।
অধ্যাপক আফসার রহমান।
ড. সামিউল করিম।
আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুই কিশোর।
একজনের নিচে লেখা...
মাহির হাসান।
অন্যজনের নামের অংশটা ছিঁড়ে গেছে।
শুধু শেষ তিনটি অক্ষর দেখা যাচ্ছে।
"...হেদী"
---
সৌরভ অবাক হয়ে বলল,
"মেহেদী?"
মারুফ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন।
"না।"
"অনুমান করা যাবে না।"
---
মেহেদী ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি।
কেন যেন মনে হচ্ছে...
সে এই জায়গায় আগে এসেছে।
কিন্তু কোনো স্মৃতি পরিষ্কার নয়।
---
হঠাৎ মিতু রেজিস্টারের শেষ পাতায় একটি অদ্ভুত বিষয় খুঁজে পেল।
প্রতিটি ছাত্রের নামের পাশে রোল নম্বর।
কিন্তু দুইজনের নামের জায়গায় রোল নম্বর কেটে নতুন নম্বর লেখা।
১৭।
১৯।
মেহেদীর চোখ বড় হয়ে গেল।
"১৭..."
"১৯..."
সৌরভ বলল,
"ওই সমীকরণ!"
১৭ × ১৯ = ৩২৩
---
মেহেদী দ্রুত বলল,
"এটা গণিতের ধাঁধা ছিল না।"
"১৭ আর ১৯ ছিল দুইজন ছাত্রের কোড নম্বর।"
---
মারুফ ধীরে বললেন,
"তাহলে ৩২৩?"
মেহেদী উত্তর দিল,
"সম্ভবত পরীক্ষার নম্বর।"
"অথবা..."
"তাদের দুজনকে নিয়ে তৈরি কোনো প্রকল্পের পরিচয়।"
---
ঠিক তখনই টিনের বাক্সের নিচে একটি অডিও ক্যাসেট পাওয়া গেল।
লেবেলে লেখা...
Experiment 323
---
সৌরভ হেসে বলল,
"এখন আবার ক্যাসেট চালাব কী দিয়ে?"
বৃদ্ধ শান্তভাবে বললেন,
"আমার কাছে এখনো পুরোনো টেপ রেকর্ডার আছে।"
---
ক্যাসেটটি চালানো হলো।
প্রথমে শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর একটি কণ্ঠ।
ড. আরিফ সালেহ।
"পরীক্ষা নম্বর ৩২৩।"
"বিষয়..."
"...মানব সিদ্ধান্ত গ্রহণের তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ।"
"অংশগ্রহণকারী..."
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর শব্দ বিকৃত হয়ে গেল।
---
মিতু বিরক্ত হয়ে বলল,
"নামটা শোনা গেল না!"
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার শব্দ পরিষ্কার হলো।
"অংশগ্রহণকারী নম্বর ১৭..."
"...উচ্চ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।"
"অংশগ্রহণকারী নম্বর ১৯..."
"...অসাধারণ অনুকরণ ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।"
---
ঘরের সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
মেহেদী ধীরে বলল,
"পর্যবেক্ষণ..."
"অনুকরণ..."
"PROJECT MIRROR..."
সবকিছু যেন এক সুতোয় গাঁথা।
---
হঠাৎ টেপের শেষ অংশে শিশুদের হাসির শব্দ শোনা গেল।
তারপর খুব ক্ষীণ একটি কণ্ঠ...
"স্যার..."
"আমরা কি বাড়ি যেতে পারি?"
সেই কণ্ঠ শুনে মেহেদীর শরীর কেঁপে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল,
"এই কণ্ঠটা..."
"আমি আগে শুনেছি।"
---
ঠিক তখনই টেপ রেকর্ডার থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করল।
মারুফ দ্রুত প্লাগ খুলে ফেললেন।
কিন্তু ততক্ষণে ক্যাসেটের ফিতা জড়িয়ে গেছে।
রেকর্ডিংয়ের বাকি অংশ নষ্ট হয়ে গেল।
বৃদ্ধ হতাশ হয়ে বললেন,
"এটাই ছিল শেষ কপি।"
মেহেদী ভাঙা ক্যাসেটটা হাতে তুলে নিল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
"না..."
"যে মানুষ এটা রেকর্ড করেছে, সে নিশ্চয়ই আরেকটা কপি কোথাও রেখে গেছে।"
ঠিক সেই মুহূর্তে লাইব্রেরির দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো ঘড়িটি হঠাৎ নিজে থেকেই বাজতে শুরু করল।
ঘড়ির পেছন থেকে ধীরে ধীরে একটি ছোট খাম মেঝেতে পড়ে গেল।
খামের ওপর মাত্র দুটি শব্দ লেখা।
"পর্ব দুই।"
চলবে...