রিক্সা,আংটি
রিকশা,আংটি ও আমি
শামীমা আকতার
১ম পর্ব
১২ ফেব্রুয়ারি' ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১১ ফেব্রুয়ারি' ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ছুটির পর কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনের রাস্তায় অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটি রিকশা পেলাম। পরপর দুটো রাস্তা পার হয়ে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিই খুব ঝক্কির ব্যাপার। সব সময় ঠিকমতো রিকশা পেতেও বেশ বেগ পেতে হয়।
৮–১০ বার প্যাডেল ঘোরানোর পর রিকশাচালক থেমে নিচু হয়ে মনে হলো কিছু একটা তুললেন। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই দেখলাম হাতে একটি ওয়ালেট। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিলাম, এটা তাঁরই ওয়ালেট—হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি আমার দিকে তাকিয়ে ওয়ালেট খুলে দেখে বললেন, “তেমন কোনো টাকা-পয়সা নেই।”
আমিও দেখলাম, শ-দেড়শ টাকার বেশি হবে না।
তাঁর কথায় বুঝলাম, ওয়ালেটটি তাঁর নয়; এইমাত্র খুঁজে পেয়েছেন। রিকশাচালক ওয়ালেটটি লুঙ্গির মধ্যে গুজে আবার চলতে শুরু করলেন।
লালদিঘী পার হয়ে টেরিবাজারের মুখে এসেই রিকশাচালক আবার থেমে গেলেন। বললেন, “রিকশার চেইন ছিড়ে গিয়েছে, আর যাওয়া সম্ভব হবে না।”
বললাম, “আপনি রিকশা ঠিক করে দেন।”
একজন রিকশাচালককে ডেকে বললেন, “উনাকে জামাল খান নিয়ে যান। চল্লিশ টাকা ভাড়া দেবেন।”
আমি নতুন রিকশাচালককে বললাম, আগের রিকশাচালককে যেন ২০ টাকা দিয়ে দেন। আমি তাঁকে ৬০ টাকা দেব। নতুন রিকশাচালক আগের রিকশাচালককে ২০ টাকা দিয়ে দিলেন।
আগের রিকশাচালক কুড়িয়ে পাওয়া ওয়ালেটটি আবার খুলে দেখলেন। ভেতরে তেমন কোনো টাকা-পয়সা নেই। কথাটা বলতে বলতেই দেখলেন, ওয়ালেটের ভেতর একদম নিচে একটি কাগজের ছোট পুটলি। হঠাৎ দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই।
কাগজের পুটলিটি নতুন রিকশাচালকের হাতে দিয়ে বললেন, “দেখেন তো, এখানে কোনো ঠিকানা লেখা আছে কি না। থাকলে যার জিনিস, তাকে দিয়ে দেওয়া যাবে।”
কথাটি বলেই তিনি তার রিকশা এক পাশে নিয়ে যাওয়ার জন্য চলে গেলেন।
নতুন রিকশাচালক পুটলি খুলে ভেতর থেকে একটি চিঠি বের করলেন। তাঁর সঙ্গে আমিও দেখলাম।
চিঠিতে লেখা ছিল—কোনো এক ভদ্রলোক খুব ব্যস্ত। তাই তিনি একজনকে (যাকে তিনি ‘ভাস্তে’ বলে সম্বোধন করেছেন) দায়িত্ব দিয়েছেন একটি ৩ ভরি ২২ ক্যারেটের আংটি পৌঁছে দিতে, মেয়ের বিয়ের জন্য। তা দিয়ে যেন একটি চেইন, কানের দুল ও চুড়ি তৈরি করে নেয়।
পুটলি থেকে সত্যি সত্যিই একটি মোটা প্লেইন আংটি বের হলো। বোঝাই যাচ্ছে, দেশের বাইরে থেকে পাঠানো। কোনো ঠিকানা পাওয়া গেল না। আমি রিকশাচালককে বললাম, “উনাকে ডাক দেন।”
পূর্বের রিকশাচালক কাছেই ছিলেন। ডাকা মাত্রই দৌড়ে এলেন। নতুন রিকশাচালক বললেন, “এটা যত্ন করে রাখেন। এখানে ৩ ভরি ২২ ক্যারেটের সোনা আছে।”
পুটলি হাতে নিয়েই রিকশাচালক বললেন, “এটা আমি আমার মালিকের বউকে দেব। একটা চেইন আর চুড়ি বানাতে বলব। যেটা দিয়ে আমার ছোট বোনকে বিয়ে দিতে পারব।”
কথাটি বলে তিনি আবার রিকশার কাছে চলে গেলেন।
এবার মনে হলো, আমার রিকশাচালকের কিছু ভাবান্তর হলো। তিনি বারবার বলতে লাগলেন, “মালিকের বউ তাকে ঠকিয়ে দেবে। সে বুঝছে না।"
তিনি আবার আগের রিকশাচালককে ডাক দিলেন।
লোকটি এলে বললেন, “আপনাকে ঠকিয়ে দেবে। আপনি মালিকের বউকে দেবেন না।”
লোকটি বললেন, “না, ঠকাবে না। আমার সব টাকা-পয়সা উনার কাছে থাকে।” কথাটি বলে তিনি যেতে উদ্যত হলে আমার রিকশাচালক বললেন, “আপনি আমার সঙ্গে চলেন। আমি আপনাকে চেইন আর চুড়ি দেব।”
লোকটি বললেন, “আমাকে নিয়ে মেরে ফেলার জন্য, আর কী!” বলে তিনি আবার তার রিকশার কাছে চলে গেলেন।
ইতোমধ্যে আমার অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। রিকশাচালককে তাগাদা দিলাম। তিনি প্যাডেল ঘোরাতে শুরু করলেন। কিন্তু মনে হলো, তার মনোজগতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
বারবার
বারবার বলতে লাগলেন, “তাকে ঠকিয়ে দেবে। আংটিটা নিয়ে আমার বউয়ের কিছু সোনা ছিল, এগুলো দিয়ে দিতে পারতাম।”
আমাকে বললেন, “আপনার যদি কোনো চেইন-টেইন থাকে, তার সঙ্গে অল্প কিছু টাকা থাকলে তা দিয়ে আংটিটা নিয়ে নেন।”
আমি বললাম, “আপনার এসব নিয়ে চিন্তার দরকার নেই। তাড়াতাড়ি চলেন, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
কিন্তু রিকশা চালাতে তাঁর মন ছিল না। বারবার থেমে পিছনে তাকাচ্ছিলেন। মোমিন রোডের মুখে এসে আবার দাঁড়িয়ে গেলেন। এমন সময় এক লোক এসে বললেন, “এক ভদ্রলোক প্রায় ৮–১০ লাখ টাকার গয়না হারিয়েছেন। এখন বাইকে করে খুঁজছেন।”
বুঝলাম, আংটিটি ভদ্রলোকটির। জিজ্ঞেস করলাম, “লোকটি এখন কোথায়?”
বললেন, “একটু আগে বাইক নিয়ে চলে গিয়েছেন।”
বুঝলাম, লোকটিকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
রিকশাচালক জিজ্ঞেস করলেন, “লোকটি দেখতে কেমন? বড়লোক নাকি গরিব?”
ভদ্রলোক বললেন, “বাইকে করে এসেছেন, নিশ্চয়ই গরিব হবেন না।”
রিকশাচালককে আবারও তাগাদা দিলাম রিকশা চালানোর জন্য। কিন্তু তার পা কিছুতেই চলছিল না।
চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে এসে বললেন, “আপনি নেমে যান। আমি আর যাব না। দেখি, ওকে ধরতে পারি কি না। আংটিটা নিয়ে আমার বউয়ের কিছু জিনিস ছিল, সেগুলো দিয়ে দিতে পারি কি না। না হলে ওকে ঠকিয়ে দেবে। আপনার কিছু টাকা-পয়সা থাকলে সেগুলো দিয়েও নিয়ে নিতে পারেন।”
আমি বললাম, “আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা বা গয়না নেই। লোকটি থানায় গিয়ে জিনিসটি জমা দিতে পারে।”
রিকশাচালক বললেন, “কার জিনিস, কোনো ঠিকানা নেই। থানায় নিয়ে গিয়েও লাভ হবে না। পুলিশরা নিয়ে নেবে।”
একবার ভাবলাম, পরিচিত এক জুয়েলারি দোকানের ঠিকানা দিয়ে ফোন করব। কিন্তু লোকটিকে আর দেখতে পেলাম না।
আবার বললাম, “আপনি চলেন।”
কিন্তু তিনি আর যেতে রাজি হলেন না।
বললাম, “আমাকে যদি এখানে নামতে হয়, তাহলে কোনো ভাড়া দেব না।”
রিকশাচালক বললেন, “ভাড়া লাগবে না।”
অগত্যা আর কথা না বাড়িয়ে নেমে গেলাম।
নামার সময় আমার হাতের আংটি দেখে বললেন, “আপনার তো জিনিস ছিল। আপনি নিয়ে নিতে পারতেন।”
দু’কদম সামনে গিয়ে আবার ফিরে এসে তাকে ভাড়াটা দিয়ে দিলাম।
সামনে দু'টো রিকশা ছিল, কোনোটাই যেতে রাজি হলো না। রিকশার জন্য আর অপেক্ষা না করে হাঁটা শুরু করলাম।
পেছনে পড়ে রইল একটি আংটি, আর সামনে খুলে গেল অদৃশ্য কিছু প্রশ্ন।
alt="image" src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=2644806242177418161">
src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=2644806242177418161" alt="image">