আজ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেলাম।
একজন ভাই গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আমার রিকশায় উঠেছিলেন। আমি তাকে নিয়ে কিছুটা পথ চললাম। দূরত্বটা খুব বেশি না হলেও ভাড়ার হিসেবে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ টাকার সমানই হবে। পথের শেষ মুহূর্তে তিনি আমাকে বিশ টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিয়ে নেমে পড়লেন এবং চলে যেতে উদ্যত হলেন।
আমি পেছন থেকে ডেকে বললাম,
“ভাই, ভাড়া তো ৪০ টাকা। আপনি কীভাবে মাত্র ২০ টাকা দিলেন? অন্তত ৩০ টাকা তো দিতেই হবে।”
কথা বাড়তে লাগল। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি কোনোভাবেই ৩০ টাকা দিতে রাজি নন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো—আমি সাধারণত এত ছোট অঙ্কের টাকার জন্য কারও সঙ্গে তর্কে জড়াই না। কিন্তু আজ কেন জানি ভেতরে এক ধরনের অকারণ জেদ কাজ করছিল। মাত্র ৫–১০ টাকার জন্যই আমি তার সঙ্গে কথার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লাম। বারবার বোঝাতে চেষ্টা করলাম, চাপ দিলাম—কিন্তু তবুও তিনি দশ টাকা দিতে রাজি হলেন না।
একপর্যায়ে লোকটি হাঁটা শুরু করলেন। আমি আবার পেছন থেকে তাকে ডাকলাম। বললাম,
“ভাই, এই দশ টাকা আমি আপনার কাছ থেকে আজ না হোক, কাল কেয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে উশুল করব।”
এই কথাটা বলতেই মুহূর্তের মধ্যে দৃশ্যটা বদলে গেল।
লোকটি হঠাৎ ঘুরে আমার দিকে দৌড়ে এল। তার এমন ত্বরিত ফিরে আসা দেখে আমি প্রথমে চমকে উঠলাম। মনে হলো—কি জানি, আবার রেগে গিয়ে হাত তুলবে না তো! বুকের ভেতর অজানা এক শঙ্কা জেগে উঠেছিল।
সে এসে আমার হাতে ২০ টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিল। বলল,
“ভাই, আপনি আমাকে মনে করিয়ে দিলেন রবের কথা। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ক্ষমা করে দিন।”
এই কথাটা বলেই সে দ্রুত চলে গেল।
আর আমি—আমি বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বিস্ময়মিশ্রিত চোখে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা দশ টাকা দিতে রাজি হচ্ছিল না, শেষ বিচারের দিনের কথা, আল্লাহর ভয় মনে পড়তেই সে স্বেচ্ছায় বিশ টাকা দিয়ে ক্ষমা চেয়ে চলে গেল!
এই ঘটনাটা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। টাকার অঙ্কটা এখানে আসল বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো—মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা ঈমান, ভয় আর বিবেক। অনেক সময় যুক্তি, তর্ক কিংবা জেদের চেয়ে একটি সত্য উচ্চারণই মানুষের ভেতরের সুপ্ত মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলে।
আজ বুঝলাম, আল্লাহর স্মরণ মানুষের হৃদয়ে কতটা শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে—যা কোনো চাপ, কোনো ঝগড়া দিয়েও সম্ভব হয় না।