প্রভাতের মৃদু আলোয় ব্যালকনিতে বসে আমি টেবিলের উপর খাতা খুলে কিছু পুরোনো স্মৃতি লিখছিলাম। চারপাশ নিস্তব্ধ, কেবল হিমেল বাতাসের হালকা স্রোত আমার গায়ের উপর বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ কর্ণকুহরে ভেসে এলো এক অদ্ভুত শব্দ—
“রফিক… রফিক…”
চমকে উঠলাম আমি। চারদিকে কেউ নেই, অথচ ডাক স্পষ্ট। আবারও ভেসে এলো সেই শব্দ—
“রফিক…”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম আমার টেবিলের দিকে। মনে হলো শব্দটি যেন ওখান থেকেই আসছে। বিস্ময়ে জিজ্ঞাস করলাম—
— “টেবিল! তুমি কি আমায় ডাকছ? তুমি কি সত্যিই কথা বলতে পার?”
মৃদু গলায় উত্তর এলো—
— “না বন্ধু, আমি তো কাঠের তৈরি, আমার মুখ নেই, কণ্ঠ নেই। কিন্তু তোমার অন্তরে আমার জন্য যে ভাবনা জন্মেছে, সেই ভাবনাই আজ ভাষা হয়ে তোমার কানে বাজছে। তুমি কি জানতে চাও আমি কে ছিলাম, কীভাবে এসেছি তোমার কাছে, কী আমার আসল আত্মকথা?”
আমি থমকে গেলাম। এ কী আশ্চর্য স্বপ্ন, নাকি জাগরণে অলৌকিক অভিজ্ঞতা? তবুও নিজেকে সামলে নিলাম। বললাম—
— “হ্যাঁ বন্ধু টেবিল, শুনতে চাই তোমার আত্মকথা। খুলে বলো তোমার নেপথ্যের গল্প।”
টেবিল যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—
— “আমার শুরুটা ছিল ক্ষুদ্র একটি দানা থেকে। এক উঁচু বৃক্ষের মগডালে আমার জন্ম। সেখানে সকালবেলায় এসে বসত নানা রঙের পাখি। তারা গান গাইত, গল্প করত, ঝগড়া করত—আমি সেইসব গল্প শুনে আনন্দে ভরে উঠতাম। প্রকৃতির কোলে আমি ছিলাম নিশ্চিন্ত।
কিন্তু জীবন তো কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না, রফিক। এক রাতে ঝড় এলো। প্রচণ্ড দমকা হাওয়ায় গাছের মগডাল ভেঙে পড়ল। আমি ছিটকে পড়লাম বালুকাময় এক নির্জন মাঠে। আমার সেই বাসা, সেই গান, সেই আশ্রয় সবই শেষ।
দিন কেটে গেল। রোদ্দুরে আমি শুকিয়ে যাচ্ছিলাম। তখনি একদিন আসমান থেকে নেমে এলো বৃষ্টির ফোঁটা। সেই বৃষ্টিই আবার আমাকে নতুন জীবন দিল। শুকনো বালু ভিজে উর্বর হলো। আমি অঙ্কুরিত হলাম, চারাগাছে রূপ নিলাম। সময় বয়ে যেতে লাগল, আমি ধীরে ধীরে পরিণত হতে লাগলাম এক বিশাল বৃক্ষে।
কখন যে বিশ বছর কেটে গেল টেরই পাইনি। তখন আমি পূর্ণ বৃক্ষ। আমার ডালে আবারও পাখিরা বাসা বাঁধত, গাইত মধুর সুরে। আমার ছায়ায় ক্লান্ত পথিকেরা বিশ্রাম নিত। দুপুরের রোদ্দুরে তারা আমার কাণ্ডে হেলান দিয়ে তন্দ্রায় যেত। অনেকেই দুঃখের কথা বলত, অনেকেই আনন্দের গান গাইত। আমি নীরব শ্রোতা হয়ে থাকতাম।
তবে রফিক, সুখের দিন বেশিদিন থাকে না। একদিন এক কাঠুরে এল ধারালো কুড়াল হাতে। সে আমার গায়ে কুড়াল চালাতে লাগল। আমি অনুনয় করলাম—‘আমাকে ছেড়ে দাও, আমি অনেক পথিকের ছায়া, আমি অনেক পাখির নিবাস।’ কিন্তু না, সে শুনল না। একের পর এক আঘাতে আমি লুটিয়ে পড়লাম।
এরপর আমাকে টেনে নিয়ে গেল ‘লস্করহাট’ নামের বাজারে। কাঠের দোকানে আমাকে বিক্রি করা হলো। সেখানে কাঠমিস্ত্রিরা আমার দেহকে চিরে বানাল তক্তা। সেই তক্তা দিয়ে তৈরি হলো অসংখ্য টেবিল, চেয়ার, খাট। আমি হারালাম আমার বৃক্ষ-পরিচয়, পেলাম নতুন পরিচয়—একটি টেবিল।
দোকানের ভেতরে আমরা সারি সারি সাজানো ছিলাম। প্রতিদিন মানুষ আসত, দেখত, কিনে নিয়ে যেত। আমার বুক কেঁপে উঠত—কে জানে আমাকে কোন হাতে, কোন ঘরে নিয়ে যাবে!
অবশেষে একদিন জামিয়া রশীদিয়া থেকে এলো এক তরুণ ছাত্র। তার চোখে জ্ঞানপিপাসার আলো। সে থেমে গেল আমার সামনে। আলতো করে আমাকে নাড়াচাড়া করে দেখল। আমি যেন বুঝতে পারছিলাম—এ আমার কাঙ্ক্ষিত বন্ধু। কিছুক্ষণ পর সে সিদ্ধান্ত নিল—আমাকেই কিনবে।
সেই দিন থেকে আজ অবধি আমি আছি তোমার সঙ্গেই, হে রফিক। তুমি আমার উপর খাতা রাখো, লিখো, কাঁদো, হাসো। আমি শুনি তোমার তেলাওয়াত, তোমার একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাস। আমি নীরব থেকেও সব শুনি, সব লিপিবদ্ধ করি আমার কাঠের অন্তরে।
দীর্ঘ যাত্রায় কত রূপান্তর, কত দুঃখ-কষ্ট, কত উত্থান-পতন! তবুও আজ আমি আনন্দিত। কারণ আমি তোমাকে পেয়েছি। তুমি আমাকে শুধু টেবিল মনে করো না; তুমি আমাকে বন্ধু মনে করো। তোমার লেখনীতে আমি জীবন্ত হয়ে উঠি। তোমার পরশে আমি বিমোহিত হই।”
টেবিলের এই আত্মকথা শুনে আমার বুক ভরে উঠল আবেগে। মনে হলো, সত্যিই আমার এই টেবিল নিছক কাঠ নয়, এটি আমার নীরব সাক্ষী, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।
alt="image" src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=719068581344355791">
style="text-align: justify;">
src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=719068581344355791" alt="image">
style="text-align: justify;">