শুরুতেই যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, "ফিলিস্তিনের সামরিক বাহিনী নেই কেন?" ইসরায়েলের যেখানে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF) এর মতো শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রয়েছে, সেখানে ফিলিস্তিনের কেনো একটিও রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী নেই? যদিও ফিলিস্তিনের কোনো প্রথাগত, রাষ্ট্র-অনুমোদিত সেনাবাহিনী নেই, তবে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। ফিলিস্তিনের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর বিভিন্ন স্তর রয়েছে, যা এই সরল প্রশ্নের উত্তরকে আরও গভীর করে তোলে। চলুন, এই কাঠামোর প্রতিটি স্তর উন্মোচন করা যাক।
রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী নয়, আছে জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী
ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল অথরিটির অধীনে একটি অফিসিয়াল সংস্থা রয়েছে, যা ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল সিকিউরিটি ফোর্সেস (PNSF) নামে পরিচিত। তবে এটি কোনো দেশের জাতীয় সেনাবাহিনীর মতো নয়।
এই বাহিনীর মূল ভূমিকা হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনা করা। এর কাজ বাইরের কোনো রাষ্ট্রের আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করা নয়, যা একটি জাতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান দায়িত্ব। তাই PNSF ফিলিস্তিনের একটি নিরাপত্তা শক্তি, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী নয়।
ইতিহাসের পাতায় এক 'মুক্তিফৌজ'
বর্তমান নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি ফিলিস্তিনের সংগ্রামের ইতিহাসে আরও পুরোনো একটি সামরিক শাখার অস্তিত্ব রয়েছে। ফিলিস্তিনের সামরিক কাঠামোর ইতিহাসে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (PLO) এবং এর সামরিক শাখা, প্যালেস্টাইন লিবারেশন আর্মি (PLA) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই 'মুক্তিফৌজ' ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক উপাদানকে প্রতিনিধিত্ব করে। বর্তমানে মাঠের বাস্তবতা এবং সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চেয়ে এটি ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপটে অবস্থান করছে।
বাস্তব ক্ষমতা আসলে কাদের হাতে?
ফিলিস্তিনের সামরিক শক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং প্রভাবশালী রূপটি আসে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্য দিয়ে, যারা স্বাধীনভাবে কাজ করে। এই গোষ্ঠীগুলোর একটি জটিল এবং বিভক্ত নেটওয়ার্ক রয়েছে, যারা ভূখণ্ডে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতার অধিকারী। সূত্র অনুসারে, প্রধান কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হলো:
• হামাস (Hamas)
• ইসলামী জিহাদ (Islamic Jihad) এবং এর শাখা আল-কুদস ব্রিগেড (Al-Quds Brigades)
• পপুলার রেজিস্ট্যান্স (Popular Resistance)
• আল-আকসা মার্টায়ার্স ব্রিগেড (Al-Aqsa Martyrs' Brigades)
• লায়ন্স ডেন (Lions' Den)
• তুলকার্ম ব্রিগেড (Tulkarm Brigade)
• আবু আলী মুস্তফা ব্রিগেড (Abu Ali Mustafa Brigades)
• ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ব্রিগেড (National Resistance Brigades)
• আব্দুল কাদের আল-হুসাইনি ব্রিগেড (Abdul Qader al-Husseini Brigades)
সূত্রানুযায়ী, হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর কাছে অ্যাসল্ট রাইফেল, গ্রেনেড লঞ্চার এবং ড্রোনের মতো অস্ত্র রয়েছে। এই অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোই বর্তমানে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক শক্তি, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী বা ঐতিহাসিক মুক্তি ফৌজের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়।
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার ছায়া
এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আন্তর্জাতিক শক্তির উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয়। আমেরিকান সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (CIA) এবং ব্রিটিশ MI6-এর মতো বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলের সামরিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
একতরফা 'আত্মরক্ষা'র বয়ান
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রায়শই একটি বাক্য শোনা যায়, যা এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সেই বাক্যটি হলো:
Israel has the right to defend itself
এই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বয়ানটি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম এবং তাদের উদ্দেশ্যকে কোন দৃষ্টিতে দেখা হবে, তার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করে দেয়।
এক বিভক্ত বাস্তবতা
সারসংক্ষেপে, ফিলিস্তিনের কোনো একক, কেন্দ্রীভূত সেনাবাহিনী না থাকার পেছনে কারণ হলো এর বিভক্ত এবং জটিল সামরিক বাস্তবতা। এখানে একদিকে যেমন রয়েছে দাপ্তরিক নিরাপত্তা বাহিনী ও একটি ঐতিহাসিক মুক্তি ফৌজ, তেমনই অন্যদিকে রয়েছে মাঠ পর্যায়ে প্রভাবশালী বিভিন্ন স্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই কাঠামোটি একক কোনো সামরিক শক্তির অনুপস্থিতিকে এক নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: এই সামরিক বিভক্তি কি ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বের স্বপ্নকে আরও জটিল করে তুলছে?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।