#বউ_আমার_ঝগড়ার_রানী ❤️
#পর্ব: ১৩
#লেখক_মিস্টার_পেন্সিল
সকালে ঘুম থেকে উঠেই জারা নওশীন প্রথমে নিজের ফোনটা খুঁজল। দাঁত ব্রাশ করার আগেই সে রুদ্র রহমানের মেসেজ চেক করল। কিন্তু নতুন কোনো মেসেজ নেই।
জারা ভ্রু কুঁচকে বিছানায় উঠে বসল।
“বাহ! গত রাতে জরুরি কথা বলবে বলে ঘুম হারাম করে দিল, আর সকালে নিজেই উধাও!”
সে রুদ্রকে লিখল—
জারা: “তোমার জরুরি কথাটা কি সরকারি গোপন নথি? এত নিরাপত্তা কেন?”
কোনো উত্তর এল না।
জারা আবার লিখল—
জারা: “শুনে রাখো, আমাকে অপেক্ষা করানোর জরিমানা কিন্তু এক কাপ চা!”
এবারও উত্তর নেই।
জারা ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, সাহেব! আজ আমিও তোমাকে পাত্তা দেব না।”
দুই মিনিট পর সে ফোনটা আবার হাতে নিল।
নতুন মেসেজ নেই।
“মানুষ এত ব্যস্ত থাকে কীভাবে?”
ঠিক তখন তানিয়া ঘরে ঢুকে বলল, “আপু, তুমি কি ফোনের সঙ্গে ঝগড়া করছ?”
জারা বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই কি জীবনে কোনোদিন দরজায় নক করতে শিখবি না?”
তানিয়া মিষ্টি হেসে বলল, “শিখব। যেদিন তুমি রুদ্র ভাইয়াকে বিয়ে করে এই বাড়ি ছেড়ে যাবে, সেদিন থেকে!”
“তানিয়া!”
“আচ্ছা, যাচ্ছি! তবে রুদ্র ভাইয়া ফোন করলে বলো, আমার আপু সকাল থেকে তার জন্য অপেক্ষা করছে!”
জারা বালিশ ছুড়ে মারল। তানিয়া দৌড়ে পালাল।
জারা নিজের রাগটা সামলে ফোনের দিকে তাকাল। মনে মনে ঠিক করল, রুদ্রের সঙ্গে দেখা হলে প্রথমেই তাকে ভালো করে বকা দেবে।
কিন্তু বুকের ভেতরের ছোট্ট একটা কণ্ঠ বলছিল, ছেলেটা সামনে এলেই তার সব রাগ আবার কোথায় যেন হারিয়ে যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে জারা দেখল, রুদ্র ক্যাম্পাসের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে তন্ময়। দুজন কী একটা নিয়ে কথা বলছিল।
জারা দূর থেকেই রুদ্রকে দেখে মুখ শক্ত করল। তারপর এমনভাবে হেঁটে গেল, যেন ছেলেটাকে সে জীবনে কোনোদিন দেখেনি।
রুদ্র তাকে দেখে ডাকল, “জারা!”
জারা থামল না।
“ঝগড়ার রানী!”
এবারও না।
তন্ময় হেসে বলল, “ভাই, মনে হচ্ছে আজ রাজ্যের রানী তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।”
রুদ্র মাথা নেড়ে বলল, “যুদ্ধের কারণটা জানি। কিন্তু শান্তিচুক্তি কীভাবে করব, সেটাই বুঝছি না।”
তন্ময় কাঁধে হাত রেখে বলল, “এক কাপ চা, সঙ্গে দুটো ফুচকা। ব্যস!”
রুদ্র হেসে উত্তর দিল, “ফুচকা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না।”
তন্ময় বলল, “তোমাদের সমস্যার নাম জারা নওশীন। ওর সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান করতে গেলে আগে নিজের বুদ্ধি বিসর্জন দিতে হবে!”
রুদ্র হাসল, কিন্তু তার চোখ বারবার জারার দিকে চলে যাচ্ছিল।
অন্যদিকে জারা ক্লাসে বসে নোট নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু খাতায় অধ্যাপকের কথার বদলে বারবার লেখা হয়ে যাচ্ছিল—‘জরুরি কথা কী?’
শেষ পর্যন্ত মিমি তার খাতা টেনে নিয়ে বলল, “এটা কী? নোটের মধ্যে রুদ্রের নাম না লিখে শুধু জরুরি কথা, জরুরি কথা লিখছিস কেন?”
জারা তাড়াতাড়ি খাতা কেড়ে নিল। “তুই আমার খাতা পড়ছিস কেন?”
মিমি চোখ টিপে বলল, “কারণ তোর খাতার চেয়ে তোর প্রেমের কাহিনি বেশি আকর্ষণীয়!”
“আমি তোকে এখনই ক্লাস থেকে বের করে দেব!”
“আগে রুদ্রকে জিজ্ঞেস কর, কী জরুরি কথা বলবে। তারপর আমাকে বের করিস।”
জারা মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু মিমির কথাটা তার মাথায় ঘুরতে থাকল।
দুপুরে ক্লাস শেষ হলে রুদ্র জারার সামনে এসে দাঁড়াল।
“একটু কথা বলা যাবে?”
জারা হাত গুটিয়ে বলল, “কী কথা? সরকারি গোপন নথি প্রকাশ করবে?”
রুদ্র বুঝল, সে রেগে আছে। তবু হাসল।
“আগে কোথাও বসি। তারপর বলছি।”
জারা ভ্রু কুঁচকে বলল, “তুমি জানো, আমি সকাল থেকে অপেক্ষা করছি?”
“জানি।”
“তাহলে উত্তর দাওনি কেন?”
রুদ্র এবার গম্ভীর হলো। “সকালে বাবার সঙ্গে একটা কাজে যেতে হয়েছিল। ফোনটা সাইলেন্ট ছিল। পরে তোমাকে উত্তর দেব ভেবেছিলাম, কিন্তু ক্লাস শুরু হয়ে গেল।”
জারা চুপ করে গেল। তার রাগের একটা অংশ তখনই গলে গেল। তবু মুখে বলল, “একটা মেসেজ দিতে কতক্ষণ লাগে?”
“তুমি ঠিক বলেছ। আমার দেওয়া উচিত ছিল। সরি।”
রুদ্র এত সহজে ক্ষমা চাওয়ায় জারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
সে আস্তে বলল, “আচ্ছা, এবার বলো। কী জরুরি কথা?”
রুদ্র তাকে নিয়ে ক্যাম্পাসের নিরিবিলি একটা বেঞ্চে বসল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল, “আমার বাবা-মা আবার তোমাদের বাসায় যাওয়ার কথা বলছেন।”
জারার বুকটা ধক করে উঠল।
“আবার বিয়ের কথা?”
“সম্ভবত। তবে আমি বাবাকে বলেছি, এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার নেই।”
জারা তার দিকে তাকাল। “তুমি কি বিয়ে করতে চাও না?”
রুদ্র একটু থামল। “আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে পরিষ্কার। কিন্তু তুমি প্রস্তুত না থাকলে শুধু আমার ইচ্ছার জন্য তোমাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বলব না।”
জারা চোখ নামিয়ে ফেলল।
রুদ্র বলল, “আমি চাই না আমাদের সম্পর্কটা শুধু দুই পরিবারের প্রত্যাশার ওপর দাঁড়িয়ে থাকুক। তুমি আমাকে নিজের ইচ্ছায় বেছে নাও, সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
জারা ধীরে বলল, “আমি তোমাকে পছন্দ করি, রুদ্র। কিন্তু বিয়ে নিয়ে ভাবলেই ভয় লাগে।”
“কেন?”
“কারণ ভালোবাসা শুরু করা সহজ হতে পারে, কিন্তু সেটা ধরে রাখা কঠিন। মানুষ বদলে যায়। সম্পর্ক বদলে যায়। আজ যে মানুষটা আমাকে এত যত্ন করে, কাল যদি সে আর এমন না থাকে?”
রুদ্র মন দিয়ে শুনল। কোনো কথা দিয়ে তার ভয়টাকে ছোট করে দেখাল না।
কিছুক্ষণ পর বলল, “আমি তোমাকে কখনো প্রতিশ্রুতি দেব না যে জীবনে আমাদের ঝগড়া হবে না, কিংবা কখনো মন খারাপ হবে না। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি—সমস্যা হলে কথা বলার চেষ্টা করব। তোমাকে বুঝতে চেষ্টা করব। আর তোমার কাছ থেকেও সেটাই চাইব।”
জারা তার দিকে তাকাল। কথাগুলো খুব সাধারণ, অথচ তার মনে হলো, এমন উত্তরই সে খুঁজছিল।
রুদ্র একটু হেসে বলল, “তবে একটা কথা সত্যি। তুমি যদি আমাকে বিয়ে করো, তাহলে প্রতিদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙবে তোমার চিৎকারে!”
জারা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আর তুমি যদি আমাকে বিয়ে করো, তাহলে প্রতিদিন তোমাকে নিজের চা নিজে বানাতে হবে!”
“আমি তো তোমার জন্য চা বানিয়ে দিই!”
“বিয়ের আগে আর বিয়ের পরে এক নিয়ম নাকি?”
রুদ্র হাসল। “বুঝেছি। ভবিষ্যতের সংসারে চা বানানোর দায়িত্ব নিয়ে এখন থেকেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে!”
জারা তার বাহুতে আলতো করে ধাক্কা দিল। “চুপ করো!”
কিন্তু এবার সে হাসিটা লুকাল না।
বিকেলে নাটকের মহড়া ছিল। সবাই নিজেদের সংলাপ নিয়ে ব্যস্ত। জারা আর রুদ্রকে আবারও শেষ দৃশ্যের অনুশীলন করতে বলা হলো।
পরিচালক বললেন, “আজ তোমরা দুজন নিজের মতো করে অনুভূতিটা প্রকাশ করার চেষ্টা করবে। সংলাপ মুখস্থ বললেই হবে না।”
মহড়া শুরু হলো।
রুদ্র জারার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি তোমাকে আমার জীবনে চাই। কিন্তু তোমাকে আমার জীবনে থাকার জন্য কোনো শর্ত দিতে চাই না।”
জারা তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার সংলাপ ছিল, ‘আমি জানি না, তোমার সঙ্গে আমার পথ কত দূর যাবে।’
কিন্তু আজ সে চিত্রনাট্যের বাইরে বলল, “আমি জানি না, সামনে কী হবে। কিন্তু তোমার সঙ্গে পথটা একবার হেঁটে দেখতে ইচ্ছে করে।”
পুরো ঘরটা কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল।
পরিচালক মুগ্ধ হয়ে বললেন, “এই তো! এই অনুভূতিটাই চাই!”
কিন্তু রুদ্র কিছু বলল না। সে শুধু জারার দিকে তাকিয়ে রইল।
মহড়া শেষ হলে সবাই বেরিয়ে গেল। জারা ব্যাগ গুছিয়ে চলে যেতে চাইছিল, এমন সময় রুদ্র তাকে ডাকল।
“জারা, একটু দাঁড়াও।”
জারা ঘুরে দাঁড়াল। “আবার কী?”
রুদ্র মৃদু হেসে বলল, “আজকের সংলাপটা সুন্দর ছিল।”
জারা মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আমি জানি।”
“এত আত্মবিশ্বাস!”
“নিজের প্রশংসা নিজে না করলে তুমি তো করবে না।”
রুদ্র একটু কাছে এসে বলল, “আমি প্রশংসা করলে তুমি আবার ভাববে, আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি।”
জারা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি তো আগেই স্বীকার করেছ।”
রুদ্রের মুখে হাসি ফুটল। “তাহলে এবার তোমার পালা।”
জারার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে জানত, রুদ্র তাকে জোর করছে না। তবু তার সামনে দাঁড়িয়ে কথাটা বলা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ।
শেষ পর্যন্ত সে আস্তে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি কি না, সেটা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। কিন্তু তোমাকে হারাতে চাই না।”
রুদ্রের চোখে কোমলতা নেমে এল।
“তাহলে আমরা তাড়াহুড়ো করব না।”
জারা অবাক হয়ে বলল, “তুমি আবারও অপেক্ষা করবে?”
“তোমার জন্য অপেক্ষা করা মানে নিজের জীবন থামিয়ে রাখা নয়, জারা। আমি আমার জীবন নিয়ে এগোব, তুমিও এগোবে। শুধু আমরা চাইলে একসঙ্গে এগোতে পারি।”
জারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার হাতটা ধরল।
এবার সে হাত ধরার কোনো অজুহাত দিল না।
রুদ্র নিচের দিকে তাকিয়ে তাদের হাতের দিকে চাইল। তারপর জারার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“এটা কি বন্ধুত্বের অংশ?”
জারা বলল, “জানি না।”
“তাহলে হাতটা ছাড়ব?”
জারা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত আরও শক্ত করে ধরল।
“একদম না!”
রুদ্র হেসে ফেলল।
জারা নিজের আচরণ বুঝতে পেরে লজ্জায় তার হাত ছেড়ে দিল। “তুমি বেশি কথা বলো!”
“আর তুমি নিজের মনের কথা বলতে গিয়ে আমাকে মারতে ইচ্ছে করো!”
“ইচ্ছে করে নয়, সুযোগ পেলে মারব!”
দুজনেই হেসে উঠল।
রাতে বাড়ি ফিরে জারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকাল। আজ তার মনে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়কে সে প্রথমবারের মতো কথায় প্রকাশ করতে পেরেছে।
ফোনে রুদ্রের মেসেজ এল।
রুদ্র: “আজ তোমার হাত ধরার ব্যাপারটা কি নাটকের মহড়ার অংশ ছিল?”
জারা: “না। তোমার হাত ঠান্ডা ছিল কি না পরীক্ষা করছিলাম।”
রুদ্র: “রিপোর্ট কী?”
জারা: “রোগীর অবস্থা ভালো। তবে রোগী অতিরিক্ত কথা বলে।”
রুদ্র: “চিকিৎসক কি নিয়মিত দেখা করবেন?”
জারা অনেকক্ষণ ভেবে উত্তর দিল—
জারা: “চিকিৎসক চেষ্টা করবেন।”
রুদ্রের মেসেজ এল—
রুদ্র: “এই চেষ্টাটুকুই আপাতত যথেষ্ট।”
জারা ফোনটা বুকে চেপে ধরে হাসল।
তার মনে হলো, তাদের সম্পর্কটা যেন নতুন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে এখনো কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নেই, বিয়ের তারিখ নেই, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও নেই। আছে শুধু দুজন মানুষের একে অপরকে বুঝতে শেখার চেষ্টা।
আর সেই চেষ্টাটুকুই জারার কাছে আজ খুব মূল্যবান।
কিন্তু তাদের এই নতুন বোঝাপড়ার খবর যে দুই পরিবারও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেছে, সেটা জারা তখনো জানত না।
পরদিন সকালে জারার মা তার ঘরে এসে বললেন, “জারা, রুদ্রের মা ফোন করেছিলেন। ওরা একটা প্রস্তাব দিয়েছেন।”
জারা চমকে উঠল। “কী প্রস্তাব?”
মা মৃদু হেসে বললেন, “তোমরা দুজন যদি রাজি থাকো, তাহলে এখনই বিয়ে নয়। আগে পরিবারের সম্মতিতে তোমাদের সম্পর্কটা এগিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। তবে সিদ্ধান্তটা তোমাদেরই।”
জারা চুপ করে রইল।
তার মনের মধ্যে রুদ্রের মুখটা ভেসে উঠল। সেই হাসি, সেই যত্ন, আর সেই কথাটা—‘আমরা তাড়াহুড়ো করব না।’
সে কি এবার নিজের ভয়কে একটু পাশে সরিয়ে রুদ্রের দিকে এগোতে পারবে?
নাকি পরিবারের নতুন প্রস্তাব তাদের সম্পর্ককে আবারও পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাবে?
জারা জানালার বাইরে তাকাল। তার ঠোঁটে ছোট্ট একটা হাসি ফুটল।
“রুদ্র রহমান, তোমার সঙ্গে ঝগড়া করা সহজ। কিন্তু তোমাকে নিয়ে ভবিষ্যতের কথা ভাবাটা যে এত কঠিন হবে, সেটা কে জানত!”
চলবে… ❤️
alt="image" src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=3150746778471024968">
src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=3150746778471024968" alt="image">