#বউ_আমার_ঝগড়ার_রানী ❤️
#পর্ব: ১২
#লেখক_মিস্টার_পেন্সিল
সকাল থেকেই জারা নওশীনের মনটা অদ্ভুত রকমের ভালো।
কেন ভালো, সেটা সে নিজেও জানে। আজ বিকেলে রুদ্র রহমানের সঙ্গে ফুচকা খেতে যাওয়ার কথা। কিন্তু ব্যাপারটা হলো, এটা যে একটা সাধারণ ফুচকা খাওয়ার দাওয়াত, সেটা জারা নিজের মনকে যতবার বোঝাচ্ছে, মন ততবারই তাকে বোকা বানিয়ে হাসছে।
আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে সে তিনটা পোশাক বিছানায় রাখল। একটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “না, এটা বেশি সাজানো হয়ে গেছে!”
দ্বিতীয়টা পরে বলল, “এটা আবার মনে হচ্ছে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি!”
তৃতীয়টা পরে আয়নায় তাকিয়ে একটু হাসল।
ঠিক তখন দরজায় তানিয়া এসে দাঁড়াল।
“আপু, ফুচকা খেতে যাওয়ার জন্য এত প্রস্তুতি? দোকানে কি বিয়ের পিঁড়ি বসেছে?”
জারা ঘুরে তাকাল। “তুই আবার কখন এলি?”
“যখন থেকে তুমি আয়নাকে জিজ্ঞেস করছ, ‘আমাকে কেমন লাগছে?’”
“আমি আয়নাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি!”
“তাহলে আয়না নিজে নিজে উত্তর দিল?”
জারা একটা বালিশ ছুড়ে মারল। তানিয়া হেসে পালিয়ে গেল।
যাওয়ার আগে চিৎকার করে বলল, “রুদ্র ভাইয়াকে বলো, ফুচকার সঙ্গে মিষ্টিও খাওয়াতে হবে!”
“তানিয়া!”
বাড়ি জারার চিৎকারে কেঁপে উঠল। অথচ আয়নার সামনে ফিরে দাঁড়াতেই তার ঠোঁটে আবার হাসি ফুটল।
“বদমাশ মেয়ে!”
বিকেল পাঁচটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের পরিচিত ফুচকার দোকানে পৌঁছে জারা দেখল, রুদ্র আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। পরনে নীল শার্ট, হাতে ঘড়ি, আর মুখে সেই চিরচেনা হাসি।
জারাকে দেখে সে বলল, “আজ সূর্য পশ্চিম দিকে উঠেছে নাকি?”
জারা ভ্রু কুঁচকাল। “কেন?”
“তুমি পাঁচ মিনিট আগে এসেছ!”
“আমি সময়ের মূল্য বুঝি।”
“অবশ্যই। বিশেষ করে যখন ফুচকা খাওয়ার সুযোগ থাকে!”
“তুমি কি সব সময় এমন বিরক্তিকর থাকবে?”
রুদ্র দোকানদারকে ডেকে বলল, “দুই প্লেট ফুচকা দেন। একটায় ঝাল কম, আর অন্যটায়—”
জারা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “আমারটায় ঝাল বেশি!”
রুদ্র তার দিকে তাকাল। “গতবারের কথা মনে নেই?”
“আমার ঝাল সহ্য করার ক্ষমতা বেড়েছে।”
“বাহ! তাহলে আজ হাসপাতালের ভাড়াটাও সঙ্গে এনেছ?”
জারা তার বাহুতে একটা চড় মেরে বলল, “তোমাকে ফুচকা খাওয়ানোর বদলে কাঁচা মরিচ খাওয়ানো উচিত!”
দোকানদার ফুচকা সাজিয়ে দিলে জারা প্রথম ফুচকাটা মুখে দিল। ঝাল লাগতেই চোখ বড় হয়ে গেল। কিন্তু রুদ্রের সামনে হার মানবে না—এটাই তার পণ।
রুদ্র সন্দেহের চোখে তাকাল। “কী হলো?”
“কিছু না।”
“চোখ দিয়ে পানি পড়ছে কেন?”
“আনন্দে!”
“ফুচকা খেয়ে এত আনন্দ? তোমার জীবনে সুখের অভাব আছে মনে হচ্ছে!”
জারা আর সহ্য করতে পারল না। পাশের পানির গ্লাস তুলে এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলল।
রুদ্র হেসে কুটিকুটি।
জারা রাগ করে বলল, “হাসো! খুব হাসো! একদিন তোমাকেও এমন ঝাল খাওয়াব!”
রুদ্র হাসতে হাসতেই পানির বোতল এগিয়ে দিল। “এই নাও, ঝগড়ার রানী। রাজ্যের পানি শেষ হওয়ার আগেই খেয়ে নাও।”
জারা বোতলটা নিয়ে বলল, “তুমি এত হাসছ কেন?”
রুদ্রের হাসি একটু নরম হলো।
“কারণ তোমাকে এভাবে হাসতে দেখতে ভালো লাগে।”
জারা থেমে গেল।
চারপাশে মানুষের কথাবার্তা, গাড়ির হর্ন আর দোকানদারের হাঁক—সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য দূরে সরে গেল।
সে চোখ নামিয়ে বলল, “তুমি না, মাঝেমধ্যে একদম অদ্ভুত কথা বলো।”
রুদ্র শান্ত গলায় বলল, “সব কথাকে মজা বলে উড়িয়ে দিতে হবে?”
জারা উত্তর দিল না। শুধু ফুচকার প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল।
রুদ্র ইচ্ছা করেই প্রসঙ্গ পাল্টাল। “আরেক প্লেট খাবা?”
জারা মাথা তুলল। “খাব। তবে বিল তুমি দেবে।”
“তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসে বিলও দেব, অপমানও সহ্য করব—এটা কি বন্ধুত্বের নিয়ম?”
“এটা আমার নিয়ম।”
“তাহলে তোমার নিয়মের বই প্রকাশ করো। নাম দিও—‘রুদ্রকে জ্বালানোর একশো এক উপায়’।”
“তুমি বইয়ের প্রথম পাঠক হবে।”
“লেখক তুমি, নায়ক আমি?”
জারা মুখ ফিরিয়ে বলল, “স্বপ্ন দেখো!”
রুদ্রের হাসির মধ্যে জারা নিজের অজান্তেই একটু বেশিক্ষণ তাকিয়ে রইল।
ফুচকা খাওয়া শেষে তারা রাস্তার পাশের ছোট্ট পার্কে গিয়ে বসল। বিকেলের আলো নরম হয়ে এসেছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের শেষ রোদ বেঞ্চের ওপর পড়ছে।
রুদ্র একটা পানির বোতল জারার দিকে এগিয়ে দিল।
“এবার সত্যি করে বলো, তোমার মন কেমন আছে?”
জারা বোতল হাতে নিয়ে বলল, “ভালো।”
“শুধু ভালো?”
“তুমি কি আমার মনের রিপোর্ট কার্ড দেখতে এসেছ?”
“না। তবে তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, মাথার ভেতর অনেক কথা ঘুরছে।”
জারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“রুদ্র, তুমি কি কখনো ভেবেছ, যদি আমরা একে অপরের খুব কাছের মানুষ হয়ে যাই, তারপর কোনো কারণে আলাদা হয়ে যাই, তাহলে কী হবে?”
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “হ্যাঁ, ভেবেছি।”
জারা অবাক হয়ে তাকাল। “তোমারও ভয় হয়?”
“অবশ্যই। তোমার রাগের ভয় তো আছেই!”
জারা চোখ রাঙাতেই সে হেসে ফেলল। তারপর গম্ভীর হয়ে বলল, “ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার জন্য আজকের ভালো মুহূর্তগুলো দূরে ঠেলে দিলে, পরে হয়তো আফসোস হবে।”
জারা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে তুমি কী চাও?”
রুদ্র তার দিকে তাকাল।
“আমি চাই, তুমি আমার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে থাকো। রাগ হলে রাগ করো, হাসতে ইচ্ছে করলে হাসো। আর যদি কখনো মনে হয়, আমি তোমার কাছে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠেছি, তাহলে অন্তত নিজের কাছে সেটা লুকিও না।”
জারার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
“আমি যদি এখনো নিশ্চিত না হই?”
“তাহলে সময় নাও। আমি তোমাকে কোনো পরীক্ষায় ফেলিনি।”
জারা মৃদু হেসে বলল, “কিন্তু তুমি নিজেই আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা!”
“আমি? আমি তো খুব সহজ মানুষ!”
“তোমার কথার মানে বুঝতে বুঝতে আমার মাথা ব্যথা হয়ে যায়!”
“তাহলে ডাক্তার দেখাও।”
“রুদ্র!”
“আচ্ছা, আর বলব না!”
দুজনেই হেসে উঠল।
হাসির মাঝেই জারা লক্ষ করল, রুদ্রের হাত তার হাতের খুব কাছে রাখা। চাইলে সে নিজের হাত সরিয়ে নিতে পারে। চাইলে একটু এগিয়েও দিতে পারে।
অনেকক্ষণ দ্বিধায় থেকে সে ধীরে নিজের হাতটা বেঞ্চের ওপর রাখল। রুদ্র তার দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না।
কয়েক মুহূর্ত পর জারা নিজের কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে রুদ্রের আঙুল ছুঁয়ে দিল।
রুদ্রের মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটল।
“এটা কি নতুন কোনো ঝগড়ার কৌশল?”
জারা হাত সরিয়ে নেওয়ার ভান করল। “হ্যাঁ। তোমার হাত পরীক্ষা করছিলাম।”
“কী পরীক্ষা?”
“তোমার হাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিক কি না।”
রুদ্র হেসে বলল, “ডাক্তার সাহেবা, রিপোর্ট কী?”
“রোগী বেশি কথা বলে। চিকিৎসা কঠিন!”
রুদ্র একটু ঝুঁকে আস্তে বলল, “তবু চিকিৎসক পাশে থাকলে রোগী খুশি।”
জারা উত্তর দিল না। তবে এবার হাত সরিয়েও নিল না।
সন্ধ্যা নামার আগে রুদ্র তাকে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দিল। রাস্তার মোড়ে এসে জারা দাঁড়াল।
“আজ ভালো লেগেছে,” সে আস্তে বলল।
রুদ্র মুচকি হাসল। “ফুচকা?”
জারা চোখ পাকাল। “সবকিছু নিয়ে মজা করতে হবে?”
“আচ্ছা, তাহলে আমিও বলি—আজ আমারও ভালো লেগেছে।”
জারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “রুদ্র, তুমি যখন আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দাও, তখন আমার খুব খারাপ লাগে।”
রুদ্রের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে মন দিয়ে জারার দিকে তাকাল।
জারা তাড়াতাড়ি বলে গেল, “মানে, বন্ধু হিসেবে বলছি! তুমি তো আমার বন্ধু। বন্ধুরা কথা না বললে খারাপ লাগতেই পারে। এর বেশি কিছু ভেবো না!”
রুদ্রের ঠোঁটে হালকা হাসি ফিরে এল।
“আমি তো এখনো কিছু ভাবিনি, ঝগড়ার রানী। তুমি নিজেই এত ব্যাখ্যা দিচ্ছ কেন?”
“তুমি আবার শুরু করেছ!”
“কী করব? তোমাকে ছাড়া আমার দিনও ভালো কাটে না।”
জারার মুখের সব কথা যেন একসঙ্গে হারিয়ে গেল।
রুদ্র মৃদু হেসে বলল, “বাসায় যাও। পৌঁছে মেসেজ দিও।”
জারা কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
“আর শোনো!”
“বলো!”
“পরেরবার ফুচকার বিল আমি দেব।”
রুদ্র অবাক হওয়ার ভান করল। “তুমি অসুস্থ নাকি?”
“তোমাকে খাওয়াতে ইচ্ছে করছে বলে!”
কথাটা বলেই জারা দৌড়ে চলে গেল।
রুদ্র রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল, জারা নিজের অনুভূতির একটা অংশ প্রকাশ করছে, যদিও এখনো সেগুলোর নাম দিতে ভয় পাচ্ছে।
রাতে বাসায় ফিরে জারা বিছানায় শুয়ে ফোন হাতে নিল। রুদ্রের মেসেজ এসেছে।
রুদ্র: “আজকের দিনটার জন্য ধন্যবাদ।”
জারা: “ফুচকা কি আমি একা খেয়েছি? আমাকেও ধন্যবাদ দাও!”
রুদ্র: “তোমাকে ধন্যবাদ দিলে তুমি আবার ভাববে আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি।”
জারা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সাহস করে লিখল—
জারা: “তুমি কি সত্যিই আমার প্রেমে পড়েছ?”
মেসেজটা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে তাড়াতাড়ি আরেকটা মেসেজ লিখতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই রুদ্রের উত্তর এল।
রুদ্র: “এই প্রশ্নের উত্তর কি সত্যিই তোমার অজানা?”
জারা নিঃশ্বাস আটকে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরের মেসেজে রুদ্র লিখল—
রুদ্র: “হ্যাঁ, জারা। তোমাকে আমার ভালো লাগে। অনেক দিন ধরেই। কিন্তু তোমার অনুভূতি কী, সেটা জানার জন্য আমি তোমাকে চাপ দিতে চাই না।”
জারার চোখের কোণে কোমলতা ফুটে উঠল। সে জানত রুদ্র তাকে পছন্দ করে, তবু কথাটা সরাসরি পড়ার পর বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে গেল।
সে লিখল—
জারা: “আমি এখনো ভয় পাই।”
রুদ্র: “ভয় পেতে পারো। শুধু ভয়টাকে তোমার হয়ে সব সিদ্ধান্ত নিতে দিয়ো না।”
জারা অনেকক্ষণ ভেবে লিখল—
জারা: “আমি জানি না এটাকে ভালোবাসা বলে কি না। কিন্তু তোমাকে আমার জীবনে চাই। তুমি পাশে থাকলে ভালো লাগে। আর তুমি দূরে গেলে আমার মন খারাপ হয়।”
মেসেজ পাঠিয়ে সে চোখ বন্ধ করল।
কয়েক মুহূর্ত পর রুদ্রের উত্তর এল।
রুদ্র: “আমার কাছে আপাতত এই কথাগুলোই অনেক, ঝগড়ার রানী। আমরা ধীরে ধীরে এগোব।”
জারা হাসল। তার মনে হলো, আজ সে নিজের মনের দরজাটা সামান্য হলেও খুলে দিয়েছে।
কিন্তু ঠিক তখনই ফোনে আরেকটি মেসেজ এল।
রুদ্র: “কাল তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে। এমন একটা বিষয়, যেটা তোমাকে আগে বলা উচিত ছিল।”
জারার হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
জারা: “কী বিষয়?”
রুদ্র আর উত্তর দিল না।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো মেসেজ না পেয়ে জারা ফোনটা পাশে রাখল। তার মনে আবার প্রশ্ন জমতে শুরু করল।
রুদ্র কী বলতে চায়? এমন কী কথা আছে, যা সে এত দিন জারাকে বলেনি?
জারা জানত না, আগামী দিনের সেই কথোপকথন তাদের সম্পর্ককে আরও কাছে নিয়ে যাবে, নাকি নতুন কোনো অভিমানের জন্ম দেবে।
তবে একটা বিষয় সে বুঝতে পেরেছে—ফুচকার ঝাল যতই হোক, রুদ্রের সঙ্গে কাটানো সময়টা তার কাছে দিন দিন আরও মিষ্টি হয়ে উঠছে।
চলবে… ❤️