যেখানে বিশ্বাসে জন্মায় স্বাধীনতা
alt="image" src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=9052817738704129554">
src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=9052817738704129554" alt="image">
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন |
বিশ্লেষণধর্মী | ৮ মার্চ, ২০২৬
রাতের মেজে ঢাকা টেবিলে গরম রুটি। মায়ের হাতে তেলের কৌটো। আর ছেলে যে কিছুতেই মাংস নিচ্ছে না—প্রথা বলে এটা নয়, নিজের বিশ্বাস বলে অন্য কিছু। মা চুপ। বাবার চোখে প্রশ্ন। টেবিলে থমক নামে, যেন খাবারের ধোঁয়ার সঙ্গে ভেসে বেড়ায় অস্বস্তি।
এই থমকই পরিবারের অদৃশ্য দেয়াল। যেখানে আমরা নিরাপদ বলে ভাবি, সেখানেই অনেক সময় চাপের জাল পাতা থাকে। যখন নিজের চিন্তা, অনুভূতি বা প্রার্থনা পরিবারের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না, তখন সেই আশ্রয়ই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ধর্ম এবং সংস্কার আমাদের জীবনের মানচিত্র। কিন্তু মাঝে মাঝে সেই মানচিত্র পথরোধ করে। কিছু ঘরে চুপচাপ থাকাই শান্তি। নিজের মত কথা বলা মানে তিক্ততা। ফলে আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে মরে যায়।
আমার বন্ধু রাহুলের কথা মনে করি। সে শুক্রবার পরিবারের সঙ্গে মসজিদে যায়। রবিবার বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়। দুই জগতের মাঝে সূক্ষ্ম একটি রেখা টানতে হয়েছে তাকে। এই পথ সহজ ছিল না। প্রথমদিকে বাবার মুখের অভিব্যক্তি, ঘরের থমক—সবই তার ভেতরে চাপ জমিয়ে রেখেছিল।
একদিন রাতের খাবারে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি শুক্রবার যাও, কিন্তু অন্য দিন কোথায় থাকো?" রাহুল থেমে গেল না। সে বলল, "বাবা, শুক্রবার আপনার সঙ্গে থাকব, কিন্তু রবিবার কিছু সময় আমারও দরকার।" ঘরে নীরবতা নামল। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরই কিছু ভাঙছিল—কিছু তৈরি হচ্ছিল।
এই মুহূর্তটি শুধু রাহুলের নয়। এক বোন, যে বিয়ের চাপে নিজের পেশার স্বপ্ন বিসর্জন দিচ্ছে। এক ভাই, যে পরিবারের ব্যবসার পথে হাঁটতে বাধ্য, যদিও তার হাত শিল্পে ওঠে। চোখে জোর করে হাসি, মাথায় জোর করে সিদ্ধান্ত গুঁজে দেওয়া হয়। কিন্তু কথা বলার সাহস—সেটাই ভেতরের জমে থাকা কথাকে মুক্তি দেয়।
রাহুলের সেই সাহসী উত্তরটি শেখায়—সত্যিকারের মুক্তি আসে নিজের মত থাকা এবং প্রকাশের মধ্য দিয়ে। সমাজ সহজে এই দ্বন্দ্ব স্বীকার করে না। আমরা শিখি চুপচাপ আনুগত্য, যেন বাড়ির সম্মান বজায় থাকে। কিন্তু সেই সম্মান কি আমাদের নিজস্ব জীবনকে রঙিন করতে দেয়? প্রায়ই দেখা যায়, নিজের পথ এবং সামাজিক প্রত্যাশা একসাথে চলতে চায় না। এই টানাপোড়েন তরুণদের মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে।
তবে রাহুল দেখিয়েছে, ধৈর্য এবং সংলাপের মাধ্যমে সমন্বয় সম্ভব। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে সে ধাপে ধাপে এগিয়েছে। শুক্রবার পরিবার, রবিবার বন্ধু—এই ভাগাভাগি সহজ ছিল না। কিন্তু স্পষ্টভাবে কথা বললে, সময়ের সঙ্গে পরিবারও বুঝতে শুরু করে।
রবিবার বিকেল। রাহুল বন্ধুদের সঙ্গে হাসছে। আর মনে মনে জানে, কিছুক্ষণ পর ঘরে ফিরতে হবে—শুক্রবারের প্রস্তুতি। এই দুই জগতের মাঝে সে তার নিজের স্থান তৈরি করেছে। টেবিলে আজও থমক আসে, কিন্তু তা আর চাপের নয়।