পড়াশোনা : শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষার্থী
src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=11125018491393793993" alt="image"> alt="image" src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=11125018491393793993">
পড়াশোনা: শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষার্থী
শামীমা আকতার
পর্ব–১
আমরা যারা সবসময় সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও যাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে—“শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো পড়াশোনা হয় না। আমরা টাকা-পয়সা খরচ করে ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠাই, কিন্তু সেখানে কোনো পড়াশোনা হয় না; আমাদের আবার কোচিং সেন্টারে দৌড়াতে হয়”—আমরা সে সব অভিভাবক চাইলে এ লেখাটি না পড়ে এড়িয়ে যেতে পারি।
দৃশ্যপট–১
৫ম পিরিয়ড। ৫ম শ্রেণির বিজ্ঞান ক্লাস।
ক্লাসে ঢুকতেই ক্লাস ক্যাপ্টেন যথানিয়মে একটি কাগজ ধরিয়ে দিল। সেখানে যারা ক্লাসে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে, তাদের নামের তালিকা। আমি কাগজটি চোখ বুলিয়ে টেবিলের এক পাশে রেখে দিলাম। একজন মনে করিয়ে দিল, “টিচার, কাগজের পেছনেও কিছু নাম আছে।”
আমি সবাইকে বই বের করতে বললাম। কিন্তু শ্রেণিনেতারা সেটা মানবে কেন? যারা ক্লাসে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে, তাদের আগে শাস্তি দিতে হবে—এই তাদের দাবি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমি সাধারণত কিছু কৌশল অবলম্বন করি, যাতে বাদী-বিবাদী দুই পক্ষেরই মান বাঁচে।
আমি বই নিয়ে সবাইকে মনোযোগী করার চেষ্টা করলাম। ভাবছিলাম, পড়ানোর ফাঁকে যাদের নাম তালিকায় আছে, তাদের প্রশ্ন করব।
কিন্তু শাস্তি না দিয়ে ক্লাস শুরু করায় একজনের একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে অসহিষ্ণুতা দেখা দিল। সে বারবার কিছু বলতে চাইছিল, চাচ্ছিল, কিন্তু গলা ধরে আসছিল—কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।
অনেকক্ষণ পর বুঝলাম, যাদের নাম তালিকায় এসেছে, তাদের অনেকেই প্রথম পিরিয়ডে পড়া না শেখার কারণে স্যার যখন তাকে বকছিলেন, তখন হাসাহাসি করছিল। এতে সে যথেষ্ট অপমানিত হয়েছে।
ইতোমধ্যে ক্লাসের অনেকটা সময় পার হয়ে গিয়েছে—ব্যাপারটি উপেক্ষা করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সম্ভব হলো না। বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল।
তার দিকে একবার তাকালাম, তারপর বই বন্ধ করলাম।
ব্যাপারটি শুনে আমরা অভিভাবকরা চাইলে একটু বিরক্ত হতেই পারি। “আমরা অনেক কষ্ট করে সন্তানদের স্কুলে পাঠাই; কেউ কেউ ছুটি না হওয়া পর্যন্ত গেটের বাইরে বসে থাকি। একটি ছেলের জন্য ষাট জন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা নষ্ট করার অধিকার শিক্ষকের নেই।” —একদম যৌক্তিক কথা।
এবার মূল ঘটনায় ফিরে আসি।
সব শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করলাম, “ও যখন বকা খাচ্ছিল, তখন কি তোমরা হাসছিলে?”
তারা সমস্বরে বলল, “আজ আমরা সবাই বকা খেয়েছি। আর সবাই হেসেছি।”
বুঝলাম, অন্যরা যেভাবে বিষয়টি মজার ছলে নিয়েছে, সে সেভাবে তা নিতে পারেনি। প্রচণ্ড মনঃকষ্ট পেয়েছে। না হলে প্রথম পিরিয়ডের ঘটনা পঞ্চম পিরিয়ড পর্যন্ত তাকে তাড়া করত না।
আমি বললাম, “তোমরা ওকে সরি বলো। বলো, তোমরা ওর বন্ধু।”
সবাই বলল, “সরি, আমরা তোমার বন্ধু।”
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কার আচরণে সে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছে। সে কয়েকজনকে দেখাল। তাদের ডেকে বললাম, ওর সঙ্গে ভাব করতে। তারা এসে কোলাকুলি করলো এবং বলল, “আমরা তোমার বন্ধু।”
style="font-size:17px">আমি style="font-size:17px">এবার আমি তাকে কাছে টেনে বললাম, “দেখলে তো, ওরা সবাই তোমার বন্ধু। বন্ধুরা মজা করলে মন খারাপ করতে নেই। বন্ধুদের সঙ্গে খেলবে, ঝগড়া করবে, দুষ্টুমি করবে, টিফিন ভাগ করে খাবে। বন্ধুদের কথায় বা আচরণে কখনও মন খারাপ করলে চলবে না।”
আমার ব্যাগে একটি চকোলেট ছিল। অন্যদের জিজ্ঞেস করলাম, “আমি যদি ওকে একটি চকোলেট দিই, তোমরা কি মন খারাপ করবে?”
style="font-size:17px">সবাই style="font-size:17px">সব কথা বলছিলাম তোমাকে পাওয়ার জন্য কথা বলছিলাম আমি সমস্বরে বলল, “না।”
এবার সে কিছুটা ধাতস্থ হলো। নিজের আবেগের জন্য হয়তো খানিকটা লজ্জাও পেল। চকোলেট নিতে চাইছিল না; অনেকটা জোর করেই দিলাম।
তার বক্তব্য থেকে বুঝলাম, সকাল থেকেই তার আগের স্কুলের জন্য মন খারাপ ছিল। সেখানেও তার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। এখানে একই ধরনের ঘটনা ঘটায় সে আরও কষ্ট পেয়েছে। বুঝলাম, সে ভীষণ অভিমানী ও কোমল হৃদয়ের। অন্যদের কাছে যা স্বাভাবিক, তার কাছে তা নয়।
আমরা অভিভাবকরা অনেক সময় এ ধরনের ঘটনায় মারমুখো মনোভাব নিয়ে অভিযোগের ডালা হাতে স্কুলে হাজির হই।
কিন্তু এই ছেলের এ শিক্ষার্থীর মাথার ওপর সারাজীবন মা-বাবা থাকবেন না। জীবনে তাকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, লজ্জা-অপমানের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। চলার পথ সবসময় মসৃণ হবে না। যারা এখন তার সহপাঠী তাদের সাথে কিংবা তাদের মতো আরও অনেকের সঙ্গে তাকে সারাজীবন চলতে হবে।
এখন থেকেই যদি সে নিজেকে প্রস্তুত করতে না পারে, তবে প্রতি পদে পদে কষ্ট পেতে হবে। আর তাকে প্রস্তুত করার কাজটি অনেকাংশেই করবে তার সহপাঠীরা, করবে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ শিক্ষা শুধু বই মুখস্থ করে হয় না; ঘরেও সব শেখানো সম্ভব নয়। বই মুখস্থ করে হয়তো ভালো নম্বর পাওয়া যাবে; কিন্তু সুস্থ জীবনবোধ তৈরির জন্য সহপাঠীদের সঙ্গে আবেগিক ও মানসিক যোগাযোগ একান্ত অনস্বীকার্য।