alt="image" src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=842647683845805872"> src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=842647683845805872" alt="image"> ক্ষুধার কষ্ট
কষ্ট ভয়ানক
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ডিসেম্বর ২১, ২০২৫
ক্ষুধা কেবল পেটের ভেতরের একটি শূন্যতা নয়—ক্ষুধা মানুষের আত্মসম্মান, চিন্তা আর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আমার জীবনে এমন সময় এসেছে, যখন নুন আনতে পান্তা ফুরিয়েছে। তখন ক্ষুধার যন্ত্রণাটা শুধু শরীরে নয়, মনেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সেই আগুন আজও নিভে যায়নি।
আমার জীবন খুব সাধারণ। অনেক সময় মনে হয়েছে, যেন আমি বিধাতার চরম অবহেলায় পড়ে আছি। তবু একটা জায়গায় এসে আমি থামি—আল্লাহকে শুকরিয়া জানাই। কারণ তিনি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এই বেঁচে থাকাটাই একসময় আমার কাছে ছিল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এইসব ভাবনার ভিড়ে হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত লাইন—
“হে দারিদ্র, তুমি মোরে করিয়াছ মহান।”
কিন্তু আমি এই কথার সঙ্গে একমত হতে পারিনি। আজও পারি না।
আমি বুঝে উঠতে পারি না—নজরুল কি দারিদ্রকে কটাক্ষ করে এই কথা বলেছিলেন, নাকি দারিদ্রতাকে সম্মান জানাতে চেয়েছিলেন? নাকি এই কথাটা ধনীরা দরিদ্রকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে, অথবা দরিদ্র মানুষ নিজেকেই প্রবোধ দেওয়ার জন্য উচ্চারণ করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও আমার কাছে অস্পষ্ট।
আমি শুধু এটুকু জানি—ক্ষুধা কখনো আমাকে মহান করেনি। ক্ষুধা আমাকে শিখিয়েছে অপমান কাকে বলে। শিখিয়েছে ঘৃণা কাকে বলে। ক্ষুধা আমাকে শিখিয়েছে, মানুষ কীভাবে মানুষকে পরজীবী মনে করতে পারে। দারিদ্রতা আমার কাছে কোনো গৌরবের প্রতীক নয়; দারিদ্রতা আমার জীবনে ছিল এক নির্মম অভিশাপ।
আমি সবসময়ই আমার ক্ষুধাকে ভয় পেয়েছি। কারণ এই সমাজে ক্ষুধা কোনো রোমান্টিক অভিজ্ঞতা নয়—এটা লজ্জা, এটা ব্যর্থতা, এটা অসহায়ত্বের নাম। দারিদ্রতা আর ক্ষুধার যন্ত্রণা আমাকে কখনোই মহান বানায়নি; বরং আমাকে প্রতিনিয়ত ছোট করেছে।
তবে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটা বিষয় বুঝেছি—একজন মানুষ কখন ভালো মানুষ হয় জানেন?
যখন আল্লাহ তাকে পরীক্ষা নেন।
ধরুন, একজন মানুষ ছোটবেলা থেকেই খাবারের কষ্ট নিয়ে বড় হয়েছে। খুব সম্ভব সে বড় হয়ে খাবার নষ্ট করবে না। কারণ তার স্মৃতিতে ক্ষুধার যন্ত্রণা আছে। তার ভেতরে অনুধাবনের তীব্রতা আছে।
কিন্তু যে মানুষ কখনো ক্ষুধায় কষ্ট পায়নি, সে এক থালা খাবারের প্রকৃত মূল্য বুঝবে কীভাবে? সে ভালো মানুষ হতে পারে, কিন্তু খাবার নষ্ট করার প্রতি তার ঘৃণা সেই পর্যায়ে পৌঁছাবে না। কারণ তার স্মৃতিতে কষ্ট নেই।
আমি দাবি করছি না যে ছোটবেলায় আমি কখনো খাবারের কষ্ট পাইনি। তবে এটাও সত্য—নিজের সংসারে ডাল-ভাত, আলুভর্তা কিংবা একটি সবজি দিয়ে কোনোভাবে ভাতের ব্যবস্থা করেছি, এমন দিনের সংখ্যা কম নয়। এই কারণেই আমি খাবার নষ্টের ব্যাপারে ভীষণ সংবেদনশীল।
কিন্তু আমার সন্তানদের মধ্যে এই সংবেদনটা আমি তৈরি করতে পারিনি। কারণ তারা গরিবি দেখেনি। আমি দেখাতেও চাইনি। হয়তো এটাই আমার ব্যর্থতা।
আজকাল বিয়ে বাড়ি, রেস্টুরেন্ট, হোটেল—সবখানেই যে পরিমাণ খাবার নষ্ট হয়, তা দিয়ে অনায়াসেই বহু মানুষের ক্ষুধা মেটানো সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের গ্রুপ কালচারে প্রতিনিয়ত নানা আয়োজন হয়। সেই আনন্দের পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থের সামান্য অংশ যদি দরিদ্র বন্ধুদের জন্য ব্যয় করা হতো, তাহলে অনেক পরিবারের এক মাসের খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যেত।
গরিবি এমন কিছু নয় যে ইচ্ছা করে তৈরি করা যায়। পকেটে টাকা থাকলে আপনি খাবার কিনবেনই। চাল-ডাল কেনার পর ব্রয়লার মুরগিও কিনবেন। অথচ এই একই মুহূর্তে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও মানুষ না খেয়ে আছে।
ফিলিস্তিনের শিশুদের ফাঁকা থালা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে অনেকেই সিম্প্যাথি অনুভব করে। আমি করি এমপ্যাথি। আমার চোখে পানি আসে। আমি আল্লাহর কাছে শুধু সুসময়ের জন্য নয়—দুঃসময়ের জন্যও বেশি কৃতজ্ঞ। কারণ ওই দুঃসময়ই আমাকে মানুষ করেছে।
গতকাল সকালে নাস্তা করার সময় এক ক্ষুধার্ত বালক আমার পাশে বসেছিল। তার ক্ষুধার তীব্রতা এতটাই ছিল যে নাস্তা শেষে সে তার বাটিটা চেটেপুটে পরিষ্কার করে খেয়েছিল। সেই দৃশ্য আমাকে আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
সবশেষে সবার কাছে আমার অনুরোধ—আল্লাহর দেওয়া খাবার খেয়ে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। দেখবেন, আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দেবেন।
আর দয়া করে কোনো অবস্থাতেই খাবার নষ্ট করবেন না।
কারণ ক্ষুধার কষ্ট—ভীষণ বড় কষ্ট।
আপনি যদি মনে করেন এই লেখা আপনাকে একটু থামতে বাধ্য করেছে—তাহলে শেয়ার করুন। হয়তো কারও ক্ষুধা কমবে।
#ক্ষুধার_কষ্ট
#খাবার_নষ্ট_করবেন_না
#মানবিকতা
#দারিদ্রতার_বাস্তবতা
#কৃতজ্ঞতা