আমার গল্প
src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=16491626378096342939" alt="image">
alt="image" src="https://idea.enolej.com/?qa=blob&qa_blobid=16491626378096342939">
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
“প্রতিটি নিঃশ্বাসই যেন নতুন যুদ্ধ, আর ICU-তে সেই লড়াই আমি নিজের চোখে দেখেছি—নীরবভাবে।”
ICU—এই তিন অক্ষর আমার জীবনে এমন একটা জায়গার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সময় আর আগের মতো থাকে না। এখানে প্রতিটি সেকেন্ড শুধু ঘড়ির কাঁটা নয়; এটা সম্ভাবনার এক টুকরো। সেই প্রথম দিন ভেতরে ঢুকতেই মনে হয়েছিল, আমি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছি যেখানে সব পরিচয়, সব অহংকার অর্থহীন। এখানে শুধু মানুষ থাকে—অসহায় মানুষ, যিনি নিজের শরীরের ভেতরের লড়াই চালাচ্ছে, আর আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে সেই লড়াইয়ের সাক্ষী হই।
ভেতরে প্রথম যে জিনিসটি চোখে পড়ে, তা শব্দ নয়—নীরবতা। সেই নীরবতার মাঝে ভেসে আসে মনিটরের টুপটাপ আওয়াজ। প্রথমে শব্দটা কানে অদ্ভুত লাগত। পরে বুঝতে পারলাম, এই শব্দেই লুকিয়ে থাকে আশা, ভয় আর প্রার্থনা। যতক্ষণ শব্দটি থেমে যায় না, ততক্ষণ কিছুটা স্বস্তি থাকে।
এখানে মানুষ কম কথা বলে। চোখ দিয়েই সব বোঝানো যায়। আমি দেখেছি একজন মা চেয়ারে বসে থাকে, ছেলের দিকে তাকিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কোনো অভিযোগ নেই, কোনো নাটক নেই, শুধু অপেক্ষা। এই অপেক্ষা সবচেয়ে ভারী, কারণ কেউ জানে না—পরের মিনিটে কী হবে।
ডাক্তারদের চোখ এখানে আলাদা। তারা আবেগ লুকিয়ে রাখে, কারণ আবেগ থাকলে সিদ্ধান্ত কঠিন হয়। তবু কখনো তারা মুখে কিছু লাইন বলে—“আজ একটু ভালো”—যা পরিবারের বুককে আরেকবার শ্বাস নিতে শেখায়। নার্সদের পদচারণা নিঃশব্দ হলেও গুরুত্বপূর্ণ। তারা আসে, দায়িত্ব পালন করে, চলে যায়। কোনো বাড়তি নাটক নেই, কোনো অতিরিক্ত শব্দ নেই।
ICU আমাদের শেখায়—জীবন আসলে কতটা নীরব। আমরা বাইরে যত শব্দ করি, জীবন ভেতরে চুপচাপ লড়াই চালায়। কেউ ঘোষণা দেয় না, কেউ চিৎকার করে না—শুধু শরীর চেষ্টা করে বাঁচতে। আর আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে সেই চেষ্টার সাক্ষী হই।
সময় ICU-তে অদ্ভুতভাবে দীর্ঘ। পাঁচ মিনিট যেন এক ঘণ্টা। রাতগুলো ভয়ঙ্কর দীর্ঘ। বাইরে পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে, আমি জেগে থাকি। কখনো প্রার্থনা করি, কখনো দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকি। ঈশ্বরের কাছে চাইতে হলে শুধু একটাই—আর একটু সময়।
ICU মানুষকে বদলে দেয়। বাইরে রাস্তায় ছোট ঝগড়া, অহেতুক রাগ, তুচ্ছ দম্ভ সব ছোট মনে হয়। এখানে শেখা যায়—ভালোবাসা মানে বক্তৃতা নয়; পাশে থাকা, উপস্থিত থাকা, না জেনেও পাশে থাকা—এটাই সবচেয়ে বড় সাহস।
মনিটরের শব্দ কখনো দ্রুত, কখনো ধীর। প্রতিটি ওঠানামায় বুক কেঁপে ওঠে। তবু এই শব্দই ভরসা। ICU-তে আশা মানে বড় কিছু নয়; শুধু আজটা পার হলে কাল আসবে। প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি সকাল, প্রতিটি সুযোগ—সবই উপহার।
ICU-তে থাকা মানুষকে নতুন চোখ দেয়। কেউ বেশি নরম হয়ে যায়, কেউ বেশি চুপচাপ। কেউ জীবনের তুচ্ছতা ঝেড়ে ফেলে। কেউ বুঝে ফেলে—সময়ই সবচেয়ে বড় সম্পদ। ICU আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন কোনো অধিকার নয়; এটা একটি সুযোগ।
ICU থেকে যখন কেউ বের হয়, তারা শুধু সুস্থ হয় না। তারা নতুন উপলব্ধি, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন শক্তি নিয়ে বের হয়। আর যারা ফিরে আসতে পারে না, তাদের নীরব লড়াই আমাদের শেখায়—জীবনকে হালকা করে নেওয়া যাবে না। ICU—যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড জীবনকে নতুন সুযোগ দেয়। আর নিঃশব্দ মনিটরের শব্দে লুকিয়ে থাকে ফিরে আসার শক্তি।
এটা আমার অভিজ্ঞতা, যা জীবন ও ভালোবাসার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়
#ICU #নীরব_যুদ্ধ #জীবন_ও_সময় #নীরব_লড়াই
#আশার_শব্দ #ভালোবাসার_শক্তি #প্রতি_নিঃশ্বাস
#ব্যক্তিগত_অভিজ্ঞতা