সরস্বতীর শেষ ইচ্ছা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | জানুয়ারি ২৩, ২০২৬
জানেন স্যার, আজ প্রায় এক বছর পেরিয়েছে, বাবুর কথাগুলো এখনও মনের কোণে গেঁথে আছে।
বাবু আমার ছোট ভাই হলেও, আমরা প্রায় সমবয়সী। বাবু আমাকে সবসময় তুই করেই বলতো। একদিন ফোনে সে বলল,
“হ্যালো ভাইয়া, আমি ভালো আছি রে। তুই কবে আসবি বল?”
আমি হেসে বলেছিলাম,
“কেন, এখনো তো আসতে দেরি আছে।”
বাবু তখন কপালে ভাঁজ দিয়ে বলল,
“না না, তুই এখুনি চলে আয়। তুই আমাকে একটা সরস্বতী ঠাকুর কিনে দিবি, বল। আমি পূজা করব, দিবি তো?”
আমি আবার হেসে উত্তর দিলাম,
“পাগল ছেলে! জানিস সরস্বতী পূজা কারা করে?
তুই কি পড়াশোনা করিস? সারাদিন তো টোটো চালিয়ে ঘুরিস। যারা গান-বাদ্য চর্চা করে, যারা স্কুলে যায়, তারা সরস্বতী পূজা করে, বুঝলি?”
কিন্তু বাবু আমার কথায় কান দিল না। সে জেদ করে বলল,
“না না, এবারে তোকে ঠাকুর কিনে দিতে হবে। আমি জামা নেব না, জুতা নেব না। আমি আবার লিখব, পড়ব। তুই ঘরে এসে দেখবি, খাতায় সব লিখে রাখব। তুই দেখিস।”
আমি হেসে বললাম,
“আচ্ছা ঠিক আছে, এত তাড়া কীসের? তবে আগে সরস্বতীর বানান লিখে দেখাস।”
বাড়ি ফিরতেই মা জিজ্ঞেস করল,
“তুই কি বললি পাগলটাকে? সারাদিন বই-খাতা নিয়ে বসে থাকে।”
স্যার, আপনি মনে রাখবেন, যখন ওকে স্কুলে পাঠানো হয়েছিল, তখন আপনারা বলেছিলেন,
“এই ছেলেকে আর স্কুলে পাঠাবেন না। খালি হাঁ করে বসে থাকে, কিছুই পারে না। এরকম বাচ্চা থাকলে স্কুলের পরিকাঠামো নষ্ট হবে।”
আমি তখন ক্লাস ফোরে। বাবুর স্কুলের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, আর ও বাড়িতেই বসে থাকে। দেখতেই দেখতেই পঁচিশটা বছর পার হয়ে গেছে। এখন বুঝি—ভালো ছেলেদের তো সবাই শিক্ষা দিতে পারে, কিন্তু যারা বোধশূন্য, বুদ্ধিহীন, তাদের জন্য শিক্ষার মানে কি?
বাজারে যাওয়ার পথে পুরোহিত মশাই বললেন,
“বাবা, তোমার পাগল ভাই প্রতিদিন রাস্তা ধরে এসে বলে—‘বাবুন, ঠাকুর আমাকে সরস্বতী পূজাটা করে দিতে হবে। আমার দাদা ঘরে এলে আমার তরে ঠাকুর আনবে।’”
অতএব মিস্ত্রির কাছ থেকে ঠাকুরের প্রতিমা নেওয়া হল। পূজার দিন যতই এগোচ্ছে, আবহাওয়াও ততই কুয়াশাচ্ছন্ন।
কিন্তু ঈশ্বরও যেন ওকে পরীক্ষার মধ্যে রাখলেন—সকল ধরনের শারীরিক অসুস্থতা প্রকাশ পেল। কাশির তীব্রতা, শ্বাসকষ্ট—সব কিছু বাড়তে লাগল। ডাক্তার বাবুর বারণ সত্ত্বেও সে বারবার ঠাকুর মিস্ত্রির কাছে যাচ্ছিল।
একদিন রাতে কাশি বেড়ে যাওয়ায় আমি বললাম,
“কিরে, ডাক্তার ডাকবো? তোর বেশি কষ্ট হচ্ছে না তো?”
ও উত্তর দিল,
“না না, আমি ঠিক আছি রে। তুই প্যান্ডেল না দিলে আমি ঠাকুর কোথায় রাখবো?”
এই বলে সে শুয়ে পড়ল।
হাসি-মুখে সে ছোট ছোট স্বপ্নে সীমাবদ্ধ থাকতো—মেলায় গিয়ে বাঁশি, মাটির পুতুল বা ছোট বেলুন। নিজস্ব রং, টাকা-পয়সা—কিছুই চাইতো না। সবাই ভাবতো, ও শান্তিতে আছে। কিন্তু শান্তি কি কখনো স্বস্তিতে থাকে? না।
শেষ রাতে, সেই নিদ্রাতেই তার শান্তি মিলল। মা সরস্বতীও শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারেননি।
আজও ওই টেবিলের ওপর ছোট ছোট খাতাগুলো রাখা আছে—মায়ের চোখে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি। পৃষ্ঠা উল্টে দেখি—প্রথমে কর, খল, ঘট…
পরে অচল, অধম, কপট, গরল…
এরপর কিছু সংখ্যার খাতা ১২৩৪৫৬…
অন্তিম পৃষ্ঠায় লেখা—
“সরস্বতী, সরস্বতী, সরস্বতী!!!!!!!!”
এটা ছিল বাবুর শেষ ইচ্ছা, তার অদম্য শখ, তার স্বপ্ন।
যে স্বপ্ন কোনো হাসপাতাল, কোনো ডাক্তার, কোনো রোগ, কোনো সময়ই নষ্ট করতে পারেনি।
সবশেষে, সে তার শিক্ষা—সাধারণ বোধের বাইরে, নিজের হৃদয়ে পূর্ণ করেছিলেন।
#সরস্বতীরগল্প #শেষইচ্ছা #অদম্যস্বপ্ন #নীরবপ্রেম #মানুষেরকাহিনী #ফেসবুকভাইরাল #গল্প #বাংলাগল্প #মনস্তাত্ত্বিকগল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।