নীরবতার শেষ হিসাব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | জানুয়ারি ২৩, ২০২৬
অভিকের বুকটা যেন কেউ চেপে ধরেছে, শ্বাস নিতে গেলে গলায় আটকে যায়।
বিছানায় শুয়ে থেকে থেকে মনে হয়, এই শরীরটা আর চলছে না। দোকানের ব্যবসা—ছোট্ট মুদির দোকান, সকালে চা-বিস্কুট বিক্রি, বিকেলে চাল-ডালের বস্তা তোলা—সব থেমে গেছে। দোকানের সামনে যে পুরনো সাইকেলটা রাখা থাকত, সেটাও ধুলোয় ঢাকা পড়ে আছে।
ডাক্তার বলেছিল, “বিশ্রাম নিন, চাপ কমান।”
কিন্তু বিশ্রাম কী জিনিস?
অভিকের কাছে তো এটা শুধু রাত জেগে হিসাব করা, আর ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করা।
নিশি পাশে বসে আছে। তার হাতে একটা পুরনো শাড়ির কোঁচড়া, যেটা সে বারবার গুটিয়ে খুলছে। চোখ দুটো লাল, কিন্তু কাঁদছে না।
কাঁদলে অভিক আরও ভেঙে পড়বে, এটা সে জানে। ঘরে একটা টেবিল ফ্যান চলছে—পাখাটা ঘুরতে ঘুরতে একটা ক্লান্ত শব্দ করে, যেন কোনো পুরনো রেকর্ডের স্ক্র্যাচ। বাইরে রাস্তায় কোনো রিকশাওয়ালা ঘণ্টি বাজিয়ে যায়, কিন্তু ভেতরে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
স্বপ্ন ফিরেছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার ব্যাগ থেকে বইয়ের গন্ধ বেরোচ্ছে—পুরনো কাগজ, কালি আর একটু ধুলো মেশানো। ছোট মেয়ে রিয়া ঘুমের মধ্যে মুখ ফিরিয়ে বলে,
“বাবা… আজ আইসক্রিম খাব…” অভিকের চোখ ভিজে ওঠে। মনে পড়ে যায়, রিয়া যখন ছোট ছিল, প্রথমবার আইসক্রিম খেয়ে তার মুখে লেগে থাকা চকোলেটটা সে আঙুল দিয়ে মুছে দিয়েছিল।
সেই মিষ্টি গন্ধটা এখনও নাকে লেগে আছে, যেন কালকের ঘটনা।
সন্ধ্যায় স্বপ্ন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গলা নামিয়ে বলল,
“বাবা… ফি-টা জমা দিতে হবে। পরশু শেষ। না হলে সেমিস্টার…”
১৮,০০০ টাকা।
অভিক কিছু বলল না। শুধু মাথা নাড়ল,
“হ্যাঁ, ঠিক আছে।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সব উল্টে যাচ্ছে। রাতে ওষুধের বোতল গুনতে গুনতে ভাবে—আজ দুটো কম খেলে কাল আরও কয়েকটা টাকা বাঁচবে।
দোকানের পুরনো খাতায় ছোট ছোট অঙ্ক লিখে রাখে। একবার তো নিজের রিস্টওয়াচটা বেচে দিয়েছিল, যেটা বিয়ের সময় নিশি কিনে দিয়েছিল। সেই ঘড়িটা এখন কার হাতে আছে কে জানে।
নিশি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে ল্যাম্পপোস্টের আলো ঘরে ঢুকছে, কিন্তু অন্ধকার কমছে না। সে মনে মনে বলে,
“কেন এত চুপ করে থাকো তুমি?”
কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না।
রাত গভীর। অভিক ঘুমাতে পারছে না। নিশি পাশে বসে ওষুধের বোতল দেখছে। তার হাতে বিয়ের একটা পুরনো ছবি—অভিকের মুখে তখন হাসি ছিল, চোখে স্বপ্ন। এখন সেই চোখ দুটো শুধু ক্লান্ত।
পরদিন সকালে স্বপ্ন আবার এল। চোখ লাল, কিন্তু হাসার চেষ্টা করছে।
“বাবা, না পারলে বলো। আমি গ্যাপ নেব। এক সেমিস্টার তো কিছু না। পরে আবার পড়ব…”
এই কথাটা শুনে অভিকের বুকটা ছিঁড়ে গেল। চোখ বন্ধ করে মনে পড়ল—স্বপ্ন যখন ক্লাস ফাইভে পড়ত, প্রথমবার ফার্স্ট হয়ে দৌড়ে এসে বলেছিল, “বাবা, দেখো!” অভিক তাকে কোলে তুলে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেই হাসির শব্দটা এখনও কানে বাজে।
কিন্তু আজ সেই মেয়ের চোখে আশা ফিকে হয়ে আসছে। অভিক বুঝল, এই আশাটুকু শেষ হয়ে যাবে।
সেই রাতে অভিক উঠে বসল। ড্রয়ার খুলে পুরনো খাতা বের করল। হলুদ পাতায় অঙ্ক। ওষুধ কম খেয়ে, দোকানের বকেয়া আদায় করে, রিস্টওয়াচ বেচে—সব মিলিয়ে ঠিক ১৮,০০০। একটা খামে চেকটা রাখল।
পেছনে লিখল: “স্বপ্নের ফি। বাবদ।” হাত কাঁপছিল।
নিশি পাশে এসে দাঁড়াল। চোখে জল। কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। অভিক শুধু হাত নাড়ল—না, বলার কিছু নেই।
ভোরবেলা নিশি উঠে দেখল—অভিক নেই। চেয়ার খালি। টেবিলে খাম। নিশি খুলল। চেক। ১৮,০০০।
হাত কাঁপতে কাঁপতে খামটা বুকে চেপে ধরল। গন্ধ পেল—অভিকের শার্টের সাবানের গন্ধ, যেটা সে নিজে কিনত। চোখের জল আর থামল না।
কয়েকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ—ফি না দেওয়ায় ভর্তি বাতিল। স্বপ্ন কাগজটা হাতে নিয়ে চুপ করে বসে রইল।
রিয়া এসে বলল, “আপু, বাবা কই?” স্বপ্ন উত্তর দিতে পারল না। শুধু বাবার পুরনো চশমাটা হাতে নিয়ে বসে রইল—যেটা সে সবসময় ঠিক করে দিত।
রাতে নিশি একা বসে খামটা ছুঁয়ে দেখে। মনে হয় অভিকের আঙুলের ছোঁয়া এখনও আছে। চোখ বন্ধ করে বলল,
“তুমি সব হিসাব মিলিয়ে দিয়েছ… কিন্তু আমাদের চোখের জল থামাতে পারোনি। নিজেকে শেষ করে আমাদের বাঁচাতে চেয়েছিলে… কিন্তু তুমি নিজে বাঁচলে না।”
স্বপ্ন কাঁদতে লাগল। রিয়া তার হাত ধরে বসে রইল। ঘরের কোণে ফ্যানটা ঘুরছে—ক্লান্ত, একঘেয়ে। বাইরে রিকশার ঘণ্টি। ভেতরে নীরবতা। শুধু জল আর নিঃশ্বাস।
অভিকের লড়াই শেষ। কিন্তু তার ছায়া ঘরে ঘুরছে—একটা চেক, একটা ছবি, আর অসমাপ্ত স্বপ্নের গন্ধ নিয়ে।
আলো নিভে আসছে। নিশি আর স্বপ্ন পাশাপাশি। নীরবতা—যা কোনো কথায় বলা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।
#নীরবতারশেষহিসাব #ডার্কবাংলাগল্প #মধ্যবিত্তট্রাজেডি #অভিক #নিশি #স্বপ্ন #ফেসবুকভাইরাল #মনস্তাত্ত্বিকগল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।