সংশোধন
ইসলামিক ধারাবাহিক_গল্প
৭ম_পর্ব
📃সেদিন সন্ধ্যায় মা'কে রান্নায় হেল্প করছিলাম, আর ভাবছিলাম মা'কে কীভাবে বলবো। রান্নার এক পর্যায়ে মা বললো,
: কী রে সুমু, কিছু বলবি? পড়ালেখা না করে এখানে কি করিস? টাকা লাগবে?
-- না মা, একটা কথা বলার ছিলো,
: সেটাতো আগেই বুঝতে পেরেছি, কী এমন কথা, তুই এত ইতস্তত করছিস।
--ইয়ে মা, আমি একজনকে ভালোবাসি, কিন্তু সে,,,,
কথা শেষ না করেই মা' কে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলাম। মা আধুনিক মানুষ। মেয়ে যাকে পছন্দ করবে তার হাতেই তুলে দিবে। মায়ের জন্য এসব কোন ব্যপার না। তাছাড়া মায়ের সাথে আমার রিলেশন বন্ধুর মতই। যে সব কথা কাউকে বলতে পারি না, সে সব মায়ের সাথে অবলীলায় শেয়ার করতে পারি। কিন্তু দাড়িওয়ালা ছেলে মা বা নানার বাড়ির পরিবারের জন্য খুব বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত। কিছুসময় আগেও আমার জন্যও ধার্মিক ছেলে অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। কিন্তু ভাগ্যের লিখন করা যায় না খন্ডন। কে জানতো দাড়িওয়ালা কাউকেই আমি পাগলের মত ভালোবেসে ফেলবো। মা আমাকে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে শান্ত করে লিভিং রুমে নিয়ে এসে বললো,
: কিন্তু কি'রে মা, বল থেমে গেলি কেন? তাছাড়া আগে পড়াশুনা শেষ করতে হবে তো।
মা, মুচকি হেসে আবার বললো, ছেলেটা কে?
-- মা আমি তাকে খুব ভালোবাসি, তাকে ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারি না।
: কে সে বলবি তো। আমাদের কষ্ট কমে গেলো। কষ্ট করে আর ছেলে খুঁজতে হবে না।
-- মা তুমি মজা নিচ্ছ, ছেলেটা ইয়াসির।
মা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলো, বললো
: কী বলিস? তুই কি সত্যিই তাকে বিয়ে করতে চাস? না কি মজা নিচ্ছিস?। আমাদের পরিবারে কোন জামাই, এমনকি কোন ছেলেও এমন নয়। তোর দাদা বাড়ির লোকজন ধার্মিক কিন্তু তাদের মধ্যেও কেউ এমন নয়। নামাজ কালাম পড়ে। কিন্তু কাপড় চোপড়ে এত কঠোর না।
-- না মা মজা নিচ্ছি না। আমি সত্যিই ইয়াসিরকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি।
: সেটা না হয় বুঝলাম। তুই কী ইয়াসিরের মা বোনের চলাফেরা দেখেছিস? কেমন প্রচণ্ড গরমেও কেমন কালো বোরকায় নিজেকে আবৃত করে রাখে। ইয়াসিরের বোন তাসনি বয়সে তোর চেয়েও অনেক ছোট, সেদিন লিফটে দেখা, চিনতেই পারিনি এত ঢিলেঢালা বোরকা পড়েছে মনে হচ্ছিলো পঁয়ত্রিশ/চল্লিশ বছরের মহিলা। দেখ, এত সুন্দর স্লীম ফিগারের মেয়েটি কেমন বুড়ি সেজে বাইরে যায়। তুই পারবি তো এমন করে নিজেকে সাজাতে?
-- হ্যা মা, আমি সবই পারবো।
: তুই আরো কয়েকদিন ভেবে তারপর আমার সাথে কথা বলিস। তারপর আমি সবার সাথে কথা বলবো।
--ভাবার দরকার নেই। তুমি যখন সময় নিতে চাচ্ছ সময় নাও।
পরেরদিন ইয়াসিরের বাসায় পড়তে যাওয়ার দরকার না হলেও পড়তে গেলাম। মা কে যখন বলে ফেলেছি, ইয়াসিরের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা দরকার। মা এগোনোর পর ইয়াসির যদি মানা করে দেয়, লজ্জায় মরে যাওয়া ছাড়া কোন পথ থাকবে না।
একটা লম্বা চিঠি লিখলাম,
" কোন সম্বোধন করতে পারলাম না, ইচ্ছে হচ্ছিল প্রিয় ইয়াসির বলি কিন্তু সে অধিকার আমি এখনো আদায় করতে পারিনি। প্রিয় স্যার বলতে ইচ্ছে করেনি, কারণ আমি তোমাকে যতটুকু আপন ভাবি, কখনো কোন ছাত্রী কোন স্যারকে ততটুকু আপন ভাবতে পারি কি না জানি না।
'আসসালামু আলাইকুম' জানো? এই সালাম দেওয়াটাও আমি তোমার কাছেই শিখেছিলাম। যে পরিবেশে আমার বড় হওয়া সেখানে সালামের ব্যবহার খুবই কম। খুব মুরব্বি ধরণের কাউকেই সালাম দেওয়া হয়। কিন্তু যেদিন তুমি বলেছিলে,
"রাসুল (স)বলেছেন, প্রথমে সালাম প্রধানকারী অহংকার থেকে মুক্ত।
সেদিন থেকেই সালামের প্র্যাক্টিস শুরু করি। আমি নিজেকে যতই সুন্দরি মনে করি না কেন, কিছুটা অহংকার থাকলেও কেন জানি না নিজেকে অহংকারী ভাবতে ভালো লাগতো না। একদিন বলেছিলে,
রাসুল (সা)বলেছেন, সম্মান আল্লাহর কাপড় এবং অহংকার তাঁর চাদর। আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে আমার সঙে ঝগড়া করবে আমি তাকে অবশ্যই শাস্তি দেবো।
(সহীহ মুসলিম,৬৪৪১)। [হাদীসে কুদসী,
( যে সমস্ত হাদীস, আল্লাহ বলেছেন রাসুল (স)এর মাধ্যমে বলেছেন কিন্তু কোরানের আয়াত নয় বা কোরানে লিপিবদ্ধ নয় বা রাসুল (স) কোরান হিসেবে লিখতে বলেননি। এই হাদীস গুলোতে আল্লাহ বলেছেন উল্লেখ থাকবে সেসকল হাদীসই হলো হাদীসে কুদসী]
রাসুল (স)বলেন, আল্লাহ পাক বলেন, অহংকার আমার চাদর এবং শ্রেষ্ঠত্ব আমার ইযার। সুতরাং যে ব্যক্তি এদু’টির কোনো একটি নিয়ে আমার সাথে বিরোধিতা করবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।’
(ইবনে মাজাহ -২/৩০৮)
এর পর থেকে কেন যেন খুব ভয় হতো। নিজেকে অংকারমুক্ত ভাবার জন্য হলেও প্রথমে সালাম দিতে চেষ্টা করতাম। বইতে অনেক পড়েছি, 'অহংকার পতনের মূল' কিন্তু এভাবে কখনোই ভাবিনি।
জানো ইয়াসির, ফেইসবুকে পর্দা সম্পর্কে খোসা ছড়ানো কলা আর চকলেটে অনেক উদাহরণ পড়েছি। পড়েছি, পর্দা নারীকে সর্বপ্রকার বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে কিন্তু তা কখনো আমার মনে বিন্দু পরিমাণও দাগ কাটতে পারেনি। একটিবারের জন্যও ভাবিনি আমারও পর্দা করা উচিৎ। এমন নয় যে আল্লাহকে ভালোবাসি না, বা আল্লাহর হুকুম অমান্য করার স্পর্দা আছে। কিন্তু যেদিন তুমি বলেছিলে, পর্দা তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারুক আর নাই পারুক, পার্দা তোমাকে মুক্তার মত দামী বানাক আর নাই বানাক তুমি পর্দা করবে কারণ তা একমাত্র আল্লাহর হুকুম বলেই। সেটা বাহ্যিক দৃষ্টিতে তোমার জন্য মঙলের হউক আর অমঙলের হউক তুমি শান্তি পাবে। যেমন আজকাল অনেকেই কিয়ামত, পরকাল এমনকি আল্লাহকেও অবিশ্বাস করে কিন্তু আমরা ঈমানদাররা, তারা যতভাবেই এগুলোর অবিশ্বাস্যতা প্রমাণ করুক আমরা বিশ্বাস করি। কারণ আল্লাহ বলেছেন কিয়ামত, পরকাল, জান্নাত জাহান্নাম সত্য, আর আমরা বিনা সন্দেহেই মেনে নিয়েছি।
ঠিক তেমন পর্দা করবে কারণ এটা একমাত্র আল্লাহ বলেছেন বলে।
যখন ভার্সিটিতে সবাই আমার বড় উড়না নিয়ে হাসাহাসি করছিলো, ঠিক তখনই মনে পড়েছিল তোমার কাছ থেকে শুনা, কোরানের আয়াতগুলো,
আল্লাহ্ বলেছেনঃ
"হে নবী ! আপনি আপনার স্ত্রীগণ ও কন্যাদেরকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না।" (সুরা আহযাবঃ ৫৯)
আল্লাহ্ বলেছেনঃ
"পার্থিব জীবনের উপর কাফেরদিগকে উম্মত্ত করে দেয়া হয়েছে। আর তারা ঈমানদারদের প্রতি লক্ষ্য করে হাসাহাসি করে। পক্ষান্তরে যারা পরহেযগার তারা সেই কাফেরদের তুলনায় কেয়ামতের দিন অত্যন্ত উচ্চমর্যাদায় থাকবে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সীমাহীন রুযী দান করেন।" (সুরা বাকারাঃ ২১২)
আল্লাহ্ আরো বলেছেনঃ
দেশে-বিদেশে কাফেরদের অবাধ চাল-চলন যেন তোমাদিগকে মোহে না ফেলে দেয়। এটা হলো সামান্য দিনের প্রাপ্তি। এরপর তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আর সেটি হলো অতি নিকৃষ্ট স্থান। (সুরা আল ইমরানঃ ১৯৬-১৯৭)
খুব শক্তি পেয়েছিলাম।
পর্দা করতেই হবে সেটা কীভাবে যেন মনের মধ্যে গেথে গেল।
জানো কী তুমি? আমার বান্ধবীদের মধ্যে অনেককেই দেখেছি বিয়ের পর বদলে গিয়েছে। অনেকেই তো কাউকে ভালোবেসে বা প্রেম করেই বিয়ের আগে থেকেই স্বামীর মত হতে শুরু করেছে। কিন্তু তুমি বলেছিলে, আমাকে ভালোবেসে বা আমার জন্য আমার মত করে বদলাতে হবে না, বদলাতে হবে একমাত্র আল্লাহকে ভালোবেসে আল্লাহর জন্য। সেদিন জানো! ঘুমাতে পারিনি। এত বেশি খুশি হয়েছিলাম।
অনেককেই বলতে শুনেছি, বয়ফ্রেন্ড বলেছে, আমার পরিবার এসব পছন্দ করে না তুমি এভাবে কাপড় পড় না একটু শালিন কাপড় পড়। একজন লম্বা নখ কেটে ফেলেছিলো, শ্বশুর বাড়ির লোকজন পছন্দ করে না বলে। কিন্তু তুমি বলেছিলে প্রতি বৃহস্পতিবার নখ কাটা সুন্নত।
কি চমৎকার! তোমার জন্য, তোমার পরিবারের মন পাওয়ার জন্য আমাকে কিছুই করতে হবে না, শুধুমাত্র আল্লাহ আর তার রাসুল (স)কে ভালোবেসে তাদের নির্দেশ পালন করলেই সবার মন খুব সহজেই পেয়ে যাব। কী এক অন্যরকম শান্তি বুঝাতে পারব না। তোমার পরিবারের জন্য নিজেকে বদলে ফেলেছি বলে একটুও আত্মসম্মানে লাগবে না।
আমার কাজিন ব্রাদার বিয়ের পরে আমাদের সাথে কথাও বলতে পারে না, ভাবি খুব জেলাস, ভাবি এসব পছন্দ করে না বলে। ভাইয়ার কথা হলো ভাইয়া ভাবিকে খুব ভালোবাসে তাই অন্য মেয়ের সাথে কথা বলাটা সহ্য হয় না।
ভাইয়াকে খুব সন্দেহ করে। প্রতিদিন মোবাইল চেক করে। আরো কতকিছু। অথচ তাদের লাভ মেরেজ। দীর্ঘ পাঁচ বছর প্রেম করে, ভাবির অনার্চ শেষ করার পরই বিয়ে করেছে।
.
কিন্তু যখন প্রথম প্রথম তোমার সাথে পরিচয় হয়েছিল, তুমি আমাকে ইগনোর করতে নিজেকে খুব ছোট মনে হতো। আমি যেহেতু নিজেকে খুবই সুন্দরী মনে করতাম তাই আমাকে ইগনোর করাটা ঠিক নিতে পারছিলাম না।
তুমি যখন এই আয়াতটি বলেছিলে,
আল্লাহ্ বলেছেন-
"মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে।"(সুরা নুর-৩০)
রাসুল (স) বলেছেন , যদি কোন মহিলার দিকে হঠাৎ নজর পড়ে যায় , তাৎক্ষণিক দৃষ্টি সরিয়ে নেবে এবং তার দিকে আর দ্বিতীয়বার তাকাবে না।
আমি অবাক হয়ে ভেবেছিলাম, আমার কাজিন ভাইয়াটা যদি এই আয়াতগুলা জানতো আর মানতো তবে ভাবি তাকে নিয়ে জেলাস হওয়া বা সন্দেহ করাটা অনেক দূরের ব্যপার প্রচন্ড ভালোবাসায় আচ্ছন্ন করে রাখতো। এমন একজন বর পেয়েছে বলে।
আমি এমন একজন বর চাই। তাই তো আমি শুধু তোমাকেই চাই। তোমাকে ভালোবাসি বলে যতখানি চাই তার চেয়ে ঢের বেশি চাই আমার আল্লাহকে তোমার মাধ্যমে চিনেছি বলে আরো চিনতে চাই বলে।
যে আমার জীবনে আসার কিছু সময়ের মধ্যেই আমি নিজেকে নিয়ে এত সিকিউর ফীল করি,সে যদি সারাজীবনের জন্য আমার লাইফে আসে তবে হয়তো এই জীবনের পাশাপাশি অই জীবনের জন্য হলেও কিঞ্চিত সঞ্চয় করতে পারবো। "
তুমি কোরানের আয়াত দিয়ে বলেছিলে,
“স্বাধীনভাবে লালসা পূরণ কিংবা গোপনে লুকিয়ে প্রেমলীলা করবে না” - (সূরা আল মায়িদা: ৫)
তাই তো প্রেমের, বিয়ের আগে ভালোবাসার চিন্তা বাদ দিয়ে বিয়েই করতে চাই।
আজ থেকে পাঁচ দিন তোমার জবাবের অপেক্ষা করবো। পাঁচদিনেও যদি জবাব না আসে। ধরে নিবো তোমাকে পাওয়াটা আমার তকদীরে ছিল না।
তুমি জানো তো ধৈর্য ধরতে আমার খুব কষ্ট হবে। এই পাঁচ দিনের প্রতিটি সেকেন্ডই একেকটি যুগের মত হবে। প্লীজ আমাকে কষ্ট দিও না। আর হ্যা, আমি ধৈর্য ধরতে শিখে গিয়েছি কারণ তুমি বলেছিলে,
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন "
(সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৩)
যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।
(সূরা ত্বালাক, আয়াত ৩)
ধৈর্য ধারণকারীদের প্রতিদান দেয়া হবে হিসাব ছাড়া।
------সূরা যুমার,আয়াত:১০
তাই আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না। অপেক্ষায় থাকবো।
আবার বলছি, ভালোবাসি।
ইতি
তোমার,,,,(তোমার কী? তুমিই লিখে নিও)
আমি তো
চলবে,,,✔
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।